রপ্তানি বহুমুখীকরণে বাধা সরকারি নীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রপ্তানি বাড়ানো ও পণ্যের বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে চার দশক ধরে অন্তত ৪৩টি উদীয়মান খাতকে নগদ সহায়তা, শুল্ক ছাড়সহ নানা ধরনের সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। গত ছয় বছরে নগদ সহায়তার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে বছরে ৭ হাজার ৮৩০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু এত প্রণোদনার পরও তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া, প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কিংবা হালকা প্রকৌশলের মতো সম্ভাবনাময় কোনো খাত বড় রপ্তানি শিল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর অন্যতম কারণ দেশের ‘অ্যান্টি-এক্সপোর্ট বায়াস’ বা রপ্তানিবিরোধী নীতি-কাঠামো। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার মনে করেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে উচ্চ আমদানি শুল্কের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজারকে এমনভাবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, যাতে উদ্যোক্তাদের জন্য দেশের বাজারেই বেশি মুনাফা করা সহজ হয়ে যায়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক-কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক যেখানে ৫ শতাংশ, সেখানে তৈরি পণ্য আমদানিতে মূল শুল্ক ২৫ শতাংশের সঙ্গে সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক যোগ হয়ে মোট শুল্কভার ৪৫ থেকে ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়। ফলে দেশীয় উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করেই ‘ট্যারিফ রেন্ট’-এর সুবিধা পান।
বিষয়টি একটি উদাহরণে পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো জুতা বা সাবানের দাম ১০০ টাকা হলে রপ্তানিকারকের নিট লাভ হয়তো ৫-১০ টাকা। কিন্তু একই পণ্য দেশে আমদানিতে ৮৭ শতাংশ শুল্ক বসলে এর দাম দাঁড়ায় ১৮৭ টাকা। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তা ১৫০-১৬০ টাকায় পণ্য বিক্রি করেও তুলনামূলক বেশি মুনাফা করতে পারেন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমে যায়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক হিসাব অনুযায়ী, পোশাকের বাইরে একই পণ্য দেশের বাজারে বিক্রি না করে রপ্তানি করলে উৎপাদকের আয় গড়ে প্রায় ৫৩ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ নীতিগত সুরক্ষার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজার অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানির চেয়ে বেশি লাভজনক।
গবেষণায় পোশাকের বাইরে ১ হাজার ৩৭৭টি পণ্যের বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর ৩৯ শতাংশ বা প্রায় ৫৩৭টি পণ্যের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারের সুরক্ষায় অভ্যস্ত উদ্যোক্তারা পণ্যের মানোন্নয়ন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতা খোঁজায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করছেন না।
তৈরি পোশাক খাতের অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই বন্ড সুবিধার মাধ্যমে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাওয়ায় এ খাত মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার মধ্যেই বেড়ে উঠেছে। অন্য খাতগুলো একই ধরনের কাঠামোগত সুবিধা পায়নি।
দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান শিল্পকে সরকারি সহায়তা দিয়েছিল নির্দিষ্ট রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের শর্তে। লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলে সুবিধা বন্ধ হয়ে যেত। বাংলাদেশে বরং নগদ সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কাছে অধিকারের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান সম্প্রাতি এক সেমিনারে বলেছেন, ‘বৈশ্বিক সুরক্ষাবাদের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরাও একধরনের স্বস্তির বলয়ে থাকতে চান। যুগ যুগ ধরে তারা চরম রক্ষণশীল। বড় কোনো সংস্কারে তারা হাত দিতে চান না। অথচ বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হতে কিংবা রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত বৈচিত্র্য আনতে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বাণিজ্যনীতি সংস্কার সবচেয়ে বেশি জরুরি।’
সেলিম রায়হানের মতে, শুধু রাজস্ব আদায়ের যুক্তিতে অস্বচ্ছ সম্পূরক শুল্ক বা প্যারা-ট্যারিফ আরোপ অযৌক্তিক। বরং পণ্যের মান ও স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। কারণ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হলে অংশীদার দেশগুলো এসব অস্বচ্ছ প্যারা-ট্যারিফ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এবং রাজস্ব আয়ের জন্য আমদানি শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। তার মতে, অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক শুল্কনীতি দেশীয় উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হতে এবং পণ্যের বহুমুখীকরণে নিরুৎসাহিত করে। তাই অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনতে হবে।



