ডলারের দাম বাড়াচ্ছে প্রকল্পের খরচ
- যেসব প্রকল্পে বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয়, সেগুলোয় গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ
- স্টোন চিপস, বিটুমিন স্টিল, পাথর ইত্যাদি আনতেও ডলারের কারণে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে
- সম্প্রতি সংশোধন হওয়া রাজধানীর দুই মেট্রোরেলের খরচ বৃদ্ধির নেপথ্যেও ডলারের দাম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে ডলারের দাম ছিল ৮৫ টাকা। অর্থাৎ ১ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে পাওয়া যেত ৮৫ টাকা। সময়ের ব্যবধানে সেই দরে এসেছে পরিবর্তন। গতকাল সোমবার রাতে ১২৪ দশমিক ৩৪ টাকায় মিলছে সেই এক ডলার। ফলে দেশে চলমান যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো তিন থেকে পাঁচ বছর আগে নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর প্রাক্কলিত ব্যয় আর সমান থাকছে না। সেই সময়ের দর ধরে ঠিক করা প্রকল্প ব্যয় বা দরপত্র দলিলে সম্ভাব্য যে খরচ দেখানো হয়েছিল, সেটিতে এখন কোনোভাবেই কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণে প্রকল্প সংশোধন করতে বাধ্য হচ্ছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, যেসব কারণে প্রকল্প সংশোধন করা হচ্ছে, এর অন্যতম হলো ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া। এ কারণে প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবও বাড়ছে। সম্প্রতি দুটি মেট্রোরেলের ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বাড়ার পেছনেও দায়ী এই ডলারের দাম।
তবে ডলারের দাম বৃদ্ধি শুধু একটি অজুহাত কি না, তা খতিয়ে দেখার ওপর জোর দিয়েছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘শুধু ঢালাওভাবে ডলারের দাম বৃদ্ধি বলা হলে সেক্ষেত্রে খতিয়ে দেখতে হবে মূল প্রকল্পটি কোন সময়ের ছিল। তখন প্রকৃত অর্থে ডলারের বিনিময় হার কত ছিল। কারণ, একটি প্রকল্প তো শুধু ডলারের দাম বাড়া-কমার ওপর নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে দেখতে হবে, ওই প্রকল্পে কতটা পণ্য এবং কত টাকার পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। সেভাবে হিসাব করে প্রকৃত অবস্থাটা বের করতে হবে। আমার কাছে মনে হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির বিষয়টি একটি অজুহাত হিসেবে দেওয়া হয়। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
জাহিদ হোসেনের মতে, সরকারের উচিত যেসব প্রকল্পে ডলারের দামের কারণে অতিমাত্রায় ব্যয় বেড়ে গেছে, সেগুলোর বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ, ওই সময়ে কস্ট বেনিফিট রেশিও আর এখন ব্যয় বাড়িয়ে বাস্তবায়নের ফলে কস্ট বেনিফিট রেশিও এক হবে না। তাই সুযোগ থাকলে বা অল্প কাজ হয়ে থাকলে এ ধরনের প্রকল্প থেকে সরে আসা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে কথা হলো পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (ভারপ্রাপ্ত সচিব) কবির আহামদের সঙ্গে। পরিকল্পনা কমিশনের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘ডলারের দাম বাড়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ বাড়ছে। এর কারণ হলো, আমাদের দেশে অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে নানা মেশিনারিজ আমদানি করতে হয়। এ ছাড়া স্টোন চিপস, বিটুমিন, স্টিল, পাথর ইত্যাদি আনতে হয় বিদেশ থেকে। যেমন বিটুমিন তৈরি নির্ভর জ্বালানি তেলের দামের ওপর। দেশে ইস্টার্ন রিফাইনারি ও বসুন্ধরা কিছু বিটুমিন উৎপাদন করে। সেটি চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তেলের দাম বাড়ায় এই বিটুমিনের দাম প্রতি টন ৭০-৮০ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ টাকার ওপরে চলে গেছে।’
এরকম প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে, সেগুলোর দাম ডলারের দাম বাড়ার কারণে বেড়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘আবার অনেক প্রাইস কোডে ডলারের রেট ধরা আছে ৮৫ টাকা। এখন তো ডলার রেট বাড়তে বাড়তে ১২২ টাকায় (সবশেষ ১২৪ টাকা) গেছে। সেক্ষেত্রে তো ওই হিসাব আর মেলে না। এভাবেই ডলারের দাম বাড়ায় উন্নয়নের খরচ বাড়ছে।’
জানা গেল, গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে রাজধানীর দুটি মেট্রোরেলের প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। দেখা যায়, প্রকল্প দুটির খরচ বেড়ে হয়েছে মূল অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুণ। এ নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। এমনকি একনেক বৈঠকে ক্ষোভ ঝাড়েন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবরা। কিন্তু প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যয় বাড়ার নেপথ্যে কাজ করেছে ডলারের দাম বৃদ্ধি।
ওই একনেক বৈঠকে ছিলেন এমন একজন জানালেন, ‘ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫) নর্দার্ন রুট’ প্রকল্পের আওতায় হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পাতাল ও উড়াল মেট্রোরেল তৈরি হচ্ছে। মূল অনুমোদিত প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ১২ হাজার ১২১ কোটি ৪৯ লাখ ৬৭ হাজার এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ থেকে ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। কিন্তু এবার প্রথম সংশোধনীতে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ২২ হাজার ৩৩০ কোটি ১১ লাখ এবং জাইকার ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
একনেক বৈঠকে প্রকল্পটির ব্যয় ১০৭ শতাংশ বৃদ্ধির কারণ জানতে চাওয়া হয়। জবাবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা ৯টি কারণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে এক নম্বর কারণটিই হলো বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং কারেন্সি মিক্স।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বললেন, ‘এ প্রকল্পের ব্যয় মূলত তিন কারণে এত বেশি বেড়েছে। এগুলো হলো— প্রথমত, কাজের পরিধি বৃদ্ধি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। বিনিময় হার বাড়ায় নির্মাণসামগ্রীর আমদানি ব্যয় বেড়েছে। তৃতীয়ত, ডলারের সঙ্গে সমন্বয় করে ভ্যাট ও আয়কর বেড়েছে। এদিকে প্রকল্পের কাজ শুরু করতেই ছয় বছর সময় পার হয়েছে। তাই ওই সময়ের ডলারের রেট আর এখনকার রেট এক নয়।’ সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবও একই ধরনের বক্তব্য দেন।
ওই বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (লাইন-১) আওতায় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর স্টেশন এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মেট্রোরেল তৈরির কাজ চলছে। প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ এবং জাইকার ঋণ থেকে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ টাকা খরচ করার কথা। কিন্তু এবার প্রথম সংশোধনীতে এসে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৩০ হাজার ৫৫২ কোটি ২৬ লাখ এবং জাইকার ঋণ থেকে ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬২ লাখ টাকা খরচের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে মূল অনুমোদিত ব্যয়ের চেয়ে বেড়েছে ৬১ হাজার ৮৩৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা ১১৭ শতাংশ বেশি।
এই ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবেও উঠে এলো ৯টি কারণ। যার চার নম্বরে রয়েছে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কথা। বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান জানতে চান, মূল্যস্ফীতি ও ডলারের বিনিময় হারের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় কত বৃদ্ধি পেয়েছে?
জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বললেন, প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এরকমভাবে অনেক প্রকল্পের ব্যয় বাড়াচ্ছে ডলারের দাম।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানালেন, বর্তমানে প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব আসা বেড়ে গেছে। এগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অন্য কারণের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও থাকছে। ফলে শুধু এই ডলারের দাম বাড়ায় শত শত কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে সরকারকে।



