প্রশ্ন ড. জিল্লুরের
সবাই বলে দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় ব্যাধি, কিন্তু সমাধান নেই কেন

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত
নাগরিক, সরকার ও রাষ্ট্র সব পক্ষই দুর্নীতিকে রাষ্ট্রীয় ব্যাধি বলে স্বীকার করলেও এর কোনো কার্যকর সমাধান না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
আজ শনিবার বাজেট অ্যানালাইসিস বিষয়ক এক ওয়েবিনারে সভাপতির বক্তব্যে এ কথা বলেছেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, বাজেটে শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়াটাই বড় কথা নয়, এর মানসম্পন্ন বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিকে বদলাতে হলে দুর্নীতি, বাস্তবায়নের ব্যর্থতা এবং অপচয়—এই তিনটি রাষ্ট্রীয় ব্যাধিকে গুরুত্ব দিয়ে সারাতে হবে। এগুলো না কমলে টেকসই উন্নয়ন ও বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এম এ সাত্তার মন্ডল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক, মালালা ফাউন্ডেশনের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ মোশারফ তানসেন এবং অ্যাকশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, বাস্তবায়ন ব্যর্থতাও দুর্নীতির সমপরিমাণ একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাধি। এটা কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হয় এবং টাকা খরচ হলেও শেষ পর্যন্ত কাজ হয় না।
দুর্নীতির মতোই আর একটি ব্যাধি হলো অপচয় উল্লেখ করে তিনি জানান, শুধু খরচেই নয়, রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে অপ্রয়োজনীয়ভাবে, যা পরবর্তীতে কোনো কাজেই আসছে না। এগুলো বন্ধ করে বাজেট ঘাটতি কমানো সম্ভব।
বাজেট পেশ করার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে। প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্রগতি মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পাশাপাশি বাজেটে বৈষম্য কমানোর বিষয়টি আরও জোরালোভাবে আনা, কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ঘটানোর আহ্বান জানান ড. জিল্লুর।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেছেন, শুধু এনবিআরের ওপর নির্ভর না করে এনবিআরবহির্ভূত করের দিকে নজর দিতে হবে। যেক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয় না। এ ছাড়া বাজেটে অর্থ বিধি তৈরির সময় স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। এখানে গোপনীয়তার কিছু নেই। উপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা করেই রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেছেন, পূর্বশর্ত নিশ্চিত করা না গেলে দেশে বড় বিনিয়োগ আসবে না। শুধু ব্যবসা সহজীকরণ করলেই হবে না, এর সঙ্গে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিশ্চয়তা দিতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এম এ সাত্তার মন্ডল প্রান্তিক কৃষকদের উন্নয়নে কাজ করার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, তারা ঠিকমতো কৃষক কার্ড পাচ্ছেন কিনা সেটি মনিটরিং করা দরকার। নব্য কৃষকদের ডায়নামিজমকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি পরিবর্তিত কৃষিকে বোঝার জন্য গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ ও নতুন চিন্তা প্রয়োজন।
অ্যাকশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর বলেছেন, সংখ্যাগতভাবে বাজেট বাড়া ইতিবাচক হলেও সেই বরাদ্দ কোথায় এবং কীভাবে খরচ হবে, সেটিই বড় বিষয়। দেশে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে, তাই এ ক্ষেত্রে আলাদা বরাদ্দ দরকার এবং নারীদের কেয়ার অর্থনীতিকে উন্নত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাইনুল ইসলামের মত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়লেও একে ‘অসম্পূর্ণ অগ্রযাত্রা’ বলা যায়। জনসংখ্যাকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে বাজেট করতে হবে। বাজেট বাড়লেও তা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট নয়। বরাদ্দের চেয়ে এর বাস্তবায়ন বেশি জরুরি।
মোশারফ তানসেন বলেছেন, অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয় বেশি হলে শিক্ষার শিখন ঘাটতি পূরণে কাজ হবে না, যা বর্তমানে সংকটে পরিণত হয়েছে। তাই বরাদ্দের বিন্যাস জরুরি। এ ছাড়া ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব পদ্ধতি বৈষম্য বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।





