দেশীয় ওষুধশিল্পের নীরব স্থপতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশ ও বিদেশে ওষুধশিল্পে ঈর্ষণীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে, তার পেছনে কাজ করেছে গুটিকয় দূরদর্শী মানুষের সাহস ও অকৃত্রিম দেশপ্রেম। সত্তরের দশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রধান উপাদান ওষুধের প্রচণ্ড অভাব, সেখানে দেশীয় প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদনের স্বপ্ন দেখা সহজ ছিল না। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া একজন আফজালুর রহমান সিনহা, যিনি স্বজন, সহকর্মী ও ক্রীড়াঙ্গনে ‘কায়সার সিনহা’ নামে পরিচিত।
তিনি ছিলেন একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, ওষুধশিল্পকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা শিল্পোদ্যোক্তা এবং ক্রীড়াঙ্গন গড়ে তোলার কারিগর। দি এক্মি ল্যাবরেটরিজের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি স্বাস্থ্যসেবার মানচিত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।
১৯৫০ সালে ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন আফজালুর রহমান সিনহা। পৈতৃক নিবাস ছিল মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার কলমা গ্রামে। তার পিতা মরহুম হামিদুর রহমান সিনহা ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। দেশীয় প্রযুক্তিতে মানসম্মত ওষুধ তৈরি করে মানুষের দৌরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্রত নিয়ে ১৯৫৪ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে ‘দি এক্মি ল্যাবরেটরিজ’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। অন্যদিকে মাতা নূরজাহান সিনহার সুদৃঢ় নীতিবোধ, পরম স্নেহ ও কড়া শাসনের ছায়ায় বেড়ে ওঠেন কায়সার সিনহা। বিদ্যালয় ও কলেজের গণ্ডি পার হয়ে আফজালুর রহমান সিনহা উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে।
১৯৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষের পাঠ অসমাপ্ত রেখেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে কারাবন্দি হলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি তিনি আবার লেখাপড়ায় মনোযোগ দেন এবং ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে ওয়েস্টার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর (এমবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। যক্তরাষ্ট্রের উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং বহুজাতিক করপোরেট সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখার সুযোগ তার মধ্যে শিল্প পরিচালনার নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। এরপর ১৯৮৩ সালে দেশে ফিরে এক্মি ল্যাবরেটরিজে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর এক্মির উৎপাদন ব্যবস্থায় সংস্কারে হাত দেন। ধামরাইয়ে এক্মির প্ল্যান্টকে আন্তর্জাতিক মানের রূপ দিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিসেস নীতিমালার পূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করেন। আধুনিক স্টেট-অব-দ্য-আর্ট ল্যাবরেটরি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইন এবং কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হয়।
তিনি ট্যাবলেট, সিরাপের মতো ওষুধের মধ্যে এক্মিকে সীমাবদ্ধ না রেখে অ্যান্টিবায়োটিক, হৃদরোগ, ডায়াবেটিক কেয়ার, ক্যানসার এবং নিউরোলজি-সংক্রান্ত জটিল ওষুধের উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করেন। পরে ভেটেরিনারি এবং হার্বাল প্রোডাক্টেও সাফল্য অর্জন করেন।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারে ওষুধ রপ্তানির পথপ্রদর্শক হিসেবে কায়সার সিনহা ছিলেন অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। তার উদ্যোগে এক্মির ওষুধ এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে রপ্তানি শুরু হয়।
২০১৪ সালে আফজালুর রহমান এক্মি ল্যাবরেটরিজের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হন। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করেন। তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠা পায় সিনহা অ্যাগ্রোভেট অ্যান্ড বেভারেজেস লিমিটেড, সিনহা প্রিন্টার্স লিমিটেড, সিনহা উল ওয়ারস, সিনহা ফেব্রিকস এবং সিনহা নিট ইন্ডাস্ট্রিজ।
তিনি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও কর্মীদের কল্যাণে এক্মিতে আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতির প্রবর্তন, শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল গঠন, উন্নত চিকিৎসার সুযোগ এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করেন।
তিনি ক্রীড়াঙ্গনের মানুষদের কাছে চিরকাল বেঁচে থাকবেন ‘কায়সার সিনহা’ নামে। ক্রীড়া প্রীতি তার রক্তে প্রবহমান ছিল এবং ক্রীড়া সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন।
আফজালুর রহমান সিনহা ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। মৃত্যুর পরও তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী দি এক্মি ল্যাবরেটরিজ অগ্রগতির ধারায় এগিয়ে চলেছেন সহধর্মিণী নাগিনা আফজাল সিনহা। তিনি বর্তমানে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান। তার যোগ্য সন্তান ফাহিম সিনহা এবং সাবরিনা সিনহা পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত থেকে পিতার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ ও আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।




