ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর আসছে বড় কর ছাড়

সংগৃহীত ছবি
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে পদে পদে বড় ধরনের কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হচ্ছে আগামী বাজেটে। উৎপাদন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে শুল্ক কমানো হচ্ছে প্রায় সব ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে। বিশেষ করে ওষুধ উৎপাদন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক পণ্য, বৈদ্যতিক যানবাহন এবং সৌরবিদ্যুৎ খাত এ ছাড়ের আওতায় থাকছে।
তবে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকীকরণের জন্য কিছু পণ্যে নতুন করে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আরোপ এবং কিছু সুরক্ষামূলক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন উৎসাহিত করতে একটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
এ ছাড়া কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার এবং জীবনরক্ষাকারী ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত নয়টি কাঁচামাল আমদানিতে কর রেয়াত সুবিধা থাকছে। পাশাপাশি ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত আরও ৬৮টি কাঁচামালের ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে। আর মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত মর্চুয়ারি আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে আগামী বাজেটে।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) কোষাধ্যক্ষ মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, এপিআই তৈরির কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের উদ্যোগ দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। এতে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে। সেই সঙ্গে রপ্তানি করার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে। আর স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়বে এবং উৎপাদন ব্যয় কমবে। এর সুফল শেষ পর্যন্ত ভোক্তারাও পাবেন।
‘বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পথে রয়েছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় শক্তিশালী এপিআই শিল্প গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের এ উদ্যোগ দেশীয় শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করবে’— যোগ করেন হালিমুজ্জামান।
শিল্প খাতে কাঁচামাল সহজলভ্য করতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসছে বাজেটে। ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনে ব্যবহৃত পাঁচটি কাঁচামালের শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিকস আমদানিতে থাকা ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হচ্ছে, যা টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে খরচ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে দেশীয় ভোজ্য তেল উৎপাদনে কর ছাড় সুবিধার মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন আমদানিতে শুল্কহার ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রত্যাহার করা হচ্ছে এ খাতে বিদ্যমান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়করও।
দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম ও সিসিটিভি ক্যামেরা উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। একই ধরনের সুবিধা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও ২০৩১ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের অংশ হিসেবে ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড় সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) আমদানিতে বিদ্যমান সর্বোচ্চ ৯৩ শতাংশ করহার কমিয়ে ২৫ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর নির্ধারণ করা হয়েছে ক্ষমতাভিত্তিক কাঠামোয়। ২০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত গাড়ির জন্য ২৫ হাজার, ৩০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৫০ হাজার, ৪০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৭৫ হাজার এবং এর বেশি ক্ষমতার গাড়ির জন্য ১ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হবে।
হাইব্রিড গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে ১৮০০ সিসি পর্যন্ত ব্র্যান্ড নিউ হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রসাধনী পণ্যের দাম কমাতে লিপস্টিক আমদানিতে প্রতি কেজির শুল্কায়ন মূল্য ৪০ থেকে কমিয়ে ৩০ ডলার নির্ধারণ করা হচ্ছে। একইভাবে লোশন, ফেস ক্রিম ও ফেসওয়াশ আমদানিতে শুল্কায়ন মূল্য প্রতি কেজিতে ১০ থেকে কমিয়ে ৭ ডলার করার প্রস্তাব রয়েছে।
কৃষি খাতেও থাকছে কিছু প্রণোদনা। কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হতে পারে। এ ছাড়া ফল সংরক্ষণে ব্যবহৃত ফ্রুট ব্যাগ তৈরির কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি পরিণত হয়েছে একটি নতুন শিল্পে। দেশের লাখ লাখ তরুণ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করে করছেন আয় এবং অবদান রাখছেন ডিজিটাল অর্থনীতিতে। এ কারণে স্টার্টআপ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের উৎসাহ বাড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের পাশাপাশি সেবা আমদানি ও অফিস ভাড়ার ক্ষেত্রেও ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে। এ সুবিধার মেয়াদ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে ৩০ জুন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত।
অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে অগ্রিম করের হার হাজারে ২ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকীকরণের অংশ হিসেবে ১১৩টি পণ্যের ওপর আরোপিত ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হচ্ছে। তবে আমদানি পর্যায়ে বর্তমানে ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত ২০টি পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে রাজস্ব নীতিতে কিছু ক্ষেত্রে কর হার বাড়ানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে। এর মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে উচ্চমূল্যের হিমায়িত মাছ আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আরোপের। এতে আমদানিনির্ভর সামুদ্রিক খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে।
কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিতে। সিগারেট ফিল্টার তৈরির কাঁচামালে ৩০০ শতাংশ এবং নিকোটিনে ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চস্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের দাম ১৮৫ থেকে বাড়িয়ে ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নিকোটিন পাউচেও বসছে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক। এ ছাড়া দেশে উৎপাদিত অ্যালকোহলের ওপর নতুন করে লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
কাজুবাদাম আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে। উচ্চমূল্যের এ খাদ্যপণ্যে নতুন শুল্ক আরোপের ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বাজারে দাম বাড়ার। মৎস্য খাতে পাঙাশ মাছের ফিলেট আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ৩৫০০ সিসির বেশি বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর ২ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে উচ্চমূল্যের গাড়ির বাজারে উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
মাইল্ড স্টিল (MS) ও রড উৎপাদন পর্যায়ে স্পেসিফিক ভ্যাট প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এতে রি-রোলেবল স্ক্র্যাপ থেকে তৈরি এমএস পণ্যে প্রতি টনে প্রায় ১৭০ এবং মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে উৎপাদিত বিলেট ও ইনগটে প্রতি টনে প্রায় ১৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত কর চাপ তৈরি হতে পারে।
বিনিয়োগের বাধা অপসারণেরও বেশ কিছু আইনি প্রতিবন্ধকতা তুলে দেওয়া হতে পারে এবারের বাজেটে। সহজে আয়কর নথি জমা দেওয়ার জন্য মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপ ব্যবস্থা চালু হতে পারে। বছরব্যাপী রিটার্ন জমার সুযোগ আসবে এবং যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দেবেন, তারা প্রদেয় করের ১০ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি কম ওই পরিমাণ কর রেয়াত পাবেন।
এর বাইরে রাজস্বসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হতে পারে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিকে সহজ ও দ্রুত করতে শর্ত সহজ করার প্রস্তাব থাকছে। ব্যবসায়ীসহ করদাতাদের কাছ থেকে কেটে রাখা অর্থ পুনরায় ফেরতের ব্যবস্থা প্রথমবারের মতো চালু হতে যাচ্ছে।
এদিকে করদাতাদের উৎসাহিত করতে এবার ৬৭ জন সেরা করদাতাকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তরা ভিআইপি সুবিধাও পাবেন, যা আগে ছিল না।




