দেশীয় সিরামিকের বিশ্বজয়
- ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা পণ্য দাপিয়ে বেড়াচ্ছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাধারণ মাটি থেকে তপ্ত আগুনে তৈরি হওয়া ঝকঝকে বাসনাদি কিংবা নান্দনিক টাইলস— এই রূপান্তরের গল্পটা শুধু একটি সাধারণ শিল্পের নয়, বরং স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা এক নতুন বাংলাদেশের। একসময় যা ছিল শতভাগ আমদানিনির্ভর, সেই সিরামিকশিল্প আজ সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ নিয়ে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা পণ্য এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্ববাজার। তবে এই অভাবনীয় সাফল্যের পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে শিল্পটি এখন মুখোমুখি হয়েছে জ্বালানি সংকটসহ বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের।
চার দশক আগের দৃশ্যপট ছিল একেবারেই ভিন্ন। থালাবাসন থেকে শুরু করে মেঝের টাইলস বা বাথরুমের স্যানিটারি সামগ্রী— সবকিছুর জন্যই আমাদের তাকিয়ে থাকতে হতো বিদেশের দিকে। ১৯৫৮ সালে যাত্রা শুরুর পর আজ দেশের মাটিতেই গড়ে উঠেছে ৭০টিরও বেশি অত্যাধুনিক সিরামিক কারখানা। এ খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে রুটি-রুজির ব্যবস্থা করেছে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের। বাসাবাড়ির ডিনার সেট বা প্লেটের চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি এখন মেটাচ্ছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে, নগরায়ণের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টাইলস ও স্যানিটারি খাতের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বাজার এখন স্থানীয় উৎপাদকদের দখলে। গত ১০ বছরে সিরামিক উৎপাদন ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫০ শতাংশের বেশি।
একসময় শুধু সাধারণ স্যানিটারি ও টেবিলওয়্যারে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন আন্তর্জাতিক মানের চীনামাটির বাসনাদি ছাড়াও হাই-এন্ড পোরসিলিন, লার্জ ফরম্যাট টাইলস ও ডিজিটাল গ্লেজড প্রোডাকট উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। কারখানাবান্ধব অটোমেশন এবং ইতালীয় ও জার্মান প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক লাইন ব্যবহারের ফলে দেশীয় সিরামিক পণ্যের নিখুঁত ফিনিশিং নিশ্চিত হচ্ছে। আধুনিক নকশা ও নান্দনিক রুচির সমন্বয় ঘটায় স্থানীয় গৃহসজ্জা থেকে শুরু করে বড় বড় বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণে দেশি টাইলসের আবেদন এখন উচ্চমাত্রায়।
প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশি সিরামিক নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও। ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোসহ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে পৌঁছাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পণ্য। এ খাতে বার্ষিক রপ্তানি আয় ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রতিযোগী চীন ও অন্যান্য পরাশক্তির পণ্যে বাড়তি অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কম শুল্ক সুবিধাকে (জিএসপি) কাজে লাগিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সিরামিক বিশেষ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
তবে বিশ্ববাজারের এই বিশাল সম্ভাবনাকে পুরোদমে কাজে লাগাতে নীতি সহায়তার তাগিদ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস নিরাপত্তা, বন্দরগুলোয় দ্রুত কাঁচামাল খালাসের ব্যবস্থা এবং দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধা দেওয়া হলে এই খাতটি তৈরি পোশাকশিল্পের পর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার শতভাগ সক্ষমতা রাখে।
তবে সফলতার এই উজ্জ্বল আলোর পেছনে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তার ছায়াও। উদ্যোক্তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে কারখানার গ্যাসসংকট। সিরামিক উৎপাদনের প্রাণ হলো দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন উচ্চতাপমাত্রায় চলা ওভেন। উৎপাদন চলাকালে হঠাৎ গ্যাসের চাপ কমে গেলে বা সরবরাহ ব্যাহত হলে মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে কোটি কোটি টাকার পণ্য। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রক্রিয়াজাত কাঁচামালের জন্য প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভরতা। ক্লে, ফেল্ডস্পার ও সিলিকার পরিশোধিত রূপের জন্য ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডের ওপর নির্ভর করতে হয় দেশের কারখানাগুলোকে। বিশ্ববাজারে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, এই আমদানিনির্ভরতা কমানোর মতো প্রাকৃতিক সম্পদ বাংলাদেশের মাটিতেই রয়েছে। নেত্রকোনার বিজয়পুরে রয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টনেরও বেশি বিশ্বমানের সাদা মাটির বিশাল মজুদ, যা জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। কিন্তু আধুনিক ‘বেনিফিশিয়েশন ও ওয়াশিং প্ল্যান্ট’ না থাকায় এই সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। অতীতে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সনাতনী পদ্ধতিতে পাহাড়ি টিলা কেটে মাটি উত্তোলনের কারণে ২০১৬ সালে হাইকোর্ট অনিয়ন্ত্রিত খনন নিষিদ্ধ করেন।
তবে সিরামিক খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিসিএমইএর দাবি, সরকার বা পিপিপি মডেলে নেত্রকোনায় আধুনিক চুম্বকীয় সেপারেটর সমৃদ্ধ একটি হাইটেক রিফাইনারি হাব গড়ে তোলা গেলে দেশেই বিশ্বমানের প্রসেসড ক্লে উৎপাদন সম্ভব হবে এবং কাঁচামাল আমদানির ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যেতে পারে। পাশাপাশি আমদানি করা কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ও অগ্রিম আয়করের চাপও কমানো প্রয়োজন। নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ধারিত চাপের গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিজয়পুরের সাদা মাটি আধুনিক ও পরিবেশসম্মত প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য প্ল্যান্ট স্থাপন এবং শুল্ক কাঠামো আরও যৌক্তিক ও নমনীয় করা গেলে এই ‘হোয়াইট গোল্ড’ শিল্পই তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী রপ্তানি শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি মইনুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিরামিকের মতো উদীয়মান ও দেশীয় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে দেশীয় চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত পণ্য রপ্তানি করে এই শিল্প বিশ্ববাজার থেকে বিশাল পরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে আনতে সক্ষম হবে।




