৪৫০০০০ বর্গফুট দিনে উৎপাদন শেলটেক সিরামিকসের

একটি ঘর শুধু ইট, বালু আর সিমেন্টে তৈরি হয় না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের ক্যানভাসে টাইলস হয়ে ওঠে ঘরের চেহারা বদলে দেওয়া এক নৈসর্গিক অনুভূতি। আর এ ভাবনা থেকেই শেলটেক সিরামিকসের জন্ম।
প্রতিষ্ঠানটির কাছে টাইলস শুধু বিক্রির পণ্য নয়; মানুষের জীবনযাপনের অংশ। যার ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালে তৈরি হয়েছে শেলটেক ফ্ল্যাগশিপ এক্সপেরিয়েন্স সেন্টার। এখানে টাইলস বিক্রি করা হয় না। বরং দেখানো হয়, একটি টাইলস ঘরের পরিবেশ কতটা বদলে দিতে পারে। বসার ঘর, শোবার ঘর, রান্নাঘর কিংবা বাথরুম; কোন জায়গায় কোন নকশা মানাবে, তা এখানে অনুভব করার সুযোগ রয়েছে।
আপনার স্বপ্নের বাড়িটি দেখতে কেমন হবে, সেটি দেখানোর জন্যই শেলটেক সিরামিকসের যাত্রা শুরু হয় বরিশাল বিভাগের ভোলায়। ২০১৯ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ৬২ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তুলেছে কারখানা।
কারখানাটিতে রয়েছে অত্যাধুনিক ইউরোপীয় প্রযুক্তিও মেশিনারিজ। পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য আছে নিজস্ব জেটি। বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে রয়েছে ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র। স্থিতিশীল প্রাকৃতিক গ্যাসের সুবিধাও রয়েছে।
অল্প সময়েই কারখানাটির দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ৪ লাখ ৫০ হাজার বর্গফুটে পৌঁছেছে। এখানে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘতম লিনিয়ার উৎপাদন লাইনগুলোর একটি। সিরামিক ও পোরসেলিন টাইলস তৈরির জন্য কাজ করছে তিনটি আলাদা উৎপাদন লাইন।
শেলটেক সিরামিকস তৈরি করছে নানা আকারের ওয়াল ও ফ্লোর টাইলস। সবচেয়ে ছোট আকার ১০×৩০ সেন্টিমিটার। সবচেয়ে বড় ১০০×১০০ সেন্টিমিটার। বাংলাদেশের বাজারে প্রথমবারের মতো ১০০×১০০ সেন্টিমিটার টাইলস নিয়ে আসে শেলটেক সিরামিকস। বড় আকারের এই টাইলস ঘরকে দেয় খোলামেলা ও আধুনিক চেহারা।
তবে আকারই শেষ কথা নয়। একটি টাইলসের আসল পরিচয় তৈরি হয় তার গুণগতমান, নকশা ও স্থায়িত্বে। এ তিন জায়গায়ই গুরুত্ব দিয়েছে শেলটেক সিরামিকস। দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের রুচিও নকশায় তুলে আনার চেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এক্সপো এবং প্রদর্শনীতে পণ্যের মান ও নকশার জন্য স্বীকৃতি পেয়েছে শেলটেক সিরামিকসের টাইলস।
এই গ্রহণযোগ্যতা এখন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। সাধারণ ক্রেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শেলটেক সিরামিকসের পণ্য ব্যবহার করছে। স্থপতি ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কাছেও ব্র্যান্ডটি হয়ে উঠছে পছন্দের প্রথম সারির নাম।
আস্থার পেছনে রয়েছে স্বীকৃত মান বজায় রাখার চেষ্টা। প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে মান ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক সনদ ISO 9001:2015 এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সনদ ISO 50001:2018। শেলটেক সিরামিকস গণপূর্ত অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি রয়েছে বিএসটিআই সনদ।
কিন্তু শেলটেক সিরামিকসের গল্প শুধু উৎপাদন আর প্রবৃদ্ধির নয়। শেলটেক সিরামিকসের লক্ষ্য ভালো মানের টাইলস তৈরি, নকশায় নতুনত্ব আর ব্যবসাটি হতে হবে পরিবেশ ও মানুষের জন্য দায়িত্বশীল।
কারখানা স্থাপনের শুরুতেই টেকসই ব্যবসার বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, শিল্পের বিকাশ যেন প্রকৃতির ক্ষতির কারণ না হয়। এই ভাবনা থেকে কারখানায় স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিকমানের ইটিপি। উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি পরিশোধনের জন্য রয়েছে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা ডব্লিউটিপি। ফলে পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার কাজটি নিয়ন্ত্রিতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে।
কারখানা এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ‘শেলটেক ইকোল্যান্ড’। শিল্পকারখানার ভেতরে যেন এক টুকরো সবুজ দ্বীপ। উন্নয়ন মানে যে সবুজ মুছে ফেলা নয়, শেলটেক সিরামিকস যেন সেই বার্তাই দেয়।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির সঙ্গে মিল রেখে শেলটেক দীর্ঘদিন ধরে নানা উদ্যোগে কাজ করছে। দায়িত্বশীল উৎপাদন, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, দক্ষতা তৈরি এবং ভোলার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এসব কাজের অংশ। এই ধারাবাহিক কাজের স্বীকৃতিও এসেছে পরপর দুই বছর। ২০২৫ সালে শেলটেক দেশের ‘মোস্ট সাসটেইনেবল রিয়েল এস্টেট কোম্পানি’ হিসেবে SDG Brand Champion Award অর্জন করে। পরের বছর, ২০২৬ সালে, শেলটেক সিরামিকস পায় দুটি স্বীকৃতি।
কারখানা থেকে তৈরি টাইলস এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। শেলটেক সিরামিকস গড়ে তুলেছে বড় সরবরাহব্যবস্থা। দেশ জুড়ে রয়েছে ১৫০টির বেশি ডিলার। বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে একাধিক গুদাম। ফলে শহর থেকে জেলা, সব জায়গায় পণ্য পৌঁছে দেওয়া সহজ হচ্ছে। মানুষ নিজের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী টাইলস বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি পেয়েছে শেলটেক সিরামিকস।
ভোলার কারখানা থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বরিশালের এক্সপেরিয়েন্স সেন্টার পুরো যাত্রাটি তাই একটি ভাবনাকে সামনে আনে। সেটি হচ্ছে শেলটেক সিরামিকস ঘরের ভাষা তৈরি করে।




