সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে বাংলাদেশ-কোরিয়ার সম্মতি

বাংলাদেশ ও কোরিয়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বেসরকারি খাতের সহযোগিতাকে নতুন গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এ লক্ষ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বসহ (পিপিপি) ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জোরদারে একটি সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনা অনুসন্ধানের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। সোমবার সিউলে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং ইআরডি ও ইনভেস্ট বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়িক চেম্বারের প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকবেন। এই গ্রুপ অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার ও বিনিয়োগের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবে।
বৈঠকে ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ ও সামুদ্রিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল ও সৃজনশীল শিল্পকে সহযোগিতার উদীয়মান ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি জ্বালানি, ওষুধ, মেডিকেল ডিভাইস, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, আধুনিক উৎপাদনশিল্প ও অবকাঠামো খাতেও কোরীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে চলমান বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কেও কোরীয় পক্ষকে অবহিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মূলধন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন, ইলেকট্রনিক্স শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক ২৬ শতাংশ থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা এবং কাস্টমস ও বন্দর কার্যক্রম আরও সহজ ও গতিশীল করার উদ্যোগ।
কৌশলগত অবকাঠামো, জ্বালানি ও অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার-টু-সরকার (জি টু জি) ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলের অধিক ব্যবহারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন অর্থমন্ত্রী।
কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্ক বাংলাদেশের সঙ্গে কোরিয়ার দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোরীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন বিষয় ও আগ্রহের কথা তুলে ধরেন, যাতে তাদের কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ আরও সহজতর করা যায়। এ বিষয়ে কোরীয় পক্ষ বাংলাদেশ সরকারের বিবেচনা ও পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য বিষয়গুলোর একটি সমন্বিত তালিকা বাংলাদেশ পক্ষকে দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনুসন্ধান কোরীয় কোম্পানিগুলোর
সফরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি কোরীয় কোম্পানির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করে বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে।
হুন্দাই গ্লোভিসের প্রেসিডেন্ট লি কিউ-বক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন ও অটোমোটিভ খাত নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ পক্ষ লজিস্টিকস হাব, বন্দর, অর্থনৈতিক ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, অটোমোটিভ সাপ্লাই চেইন এবং স্মার্ট লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরে। হুন্দাই গ্লোভিস বাংলাদেশে সম্ভাবনা অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করে। সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষ ওয়ার্কিং-লেভেল টিম গঠনে সম্মত হয়েছে।
হানওয়া ওশানের সঙ্গে বৈঠকে জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত ও ড্রাই-ডকিং, সামুদ্রিক অবকাঠামো এবং ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। হানওয়া ওশান প্রথম পর্যায়ে জাহাজ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও রেট্রোফিটিং দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে পরবর্তী সময়ে উচ্চমূল্য সংযোজিত জাহাজ নির্মাণ ও অন্যান্য সামুদ্রিক কার্যক্রমে সম্প্রসারণের একটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পদ্ধতি প্রস্তাব করে। উভয় পক্ষ পরবর্তী কারিগরি আলোচনা ও ফলো-আপ সফরের মাধ্যমে বিষয়গুলো এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের প্রেসিডেন্ট কিম উ-জুন ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করে। বৈঠকে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল কানেক্টিভিটি এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী স্যামসাংকে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান চালুর সম্ভাবনা অনুসন্ধানের আহ্বান জানান। প্রেসিডেন্ট কিম বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার সম্ভাবনা অনুসন্ধানে স্যামসাংয়ের আগ্রহের কথা জানান।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘সিইপিএ-পরবর্তী সুযোগকে বাস্তব ও দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে বাংলাদেশ কোরিয়া সরকার ও কোরীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ–কোরিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পের বহুমুখীকরণ, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশের আরও গভীর সংযুক্তি। এর মাধ্যমে উভয় দেশের জন্য নতুন প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে।’



