বরাদ্দ বাড়ল বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে
- মধ্যপ্রাচ্য সংকটে অর্থনীতিতে চাপ
- ২০৩০ সালে ৩৫ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য

সংগৃহীত ছবি
জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা; অর্থাৎ নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৯৩ কোটি টাকা।
আজ বৃহস্পতিবার বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এই বরাদ্দের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি চলমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট বহুমুখী চাপের চিত্র তুলে ধরেন।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ধাক্কা
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংকট শুরু হয়, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি আকস্মিক ও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সার্বিক মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ভর্তুকির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।
একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অর্থমন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যেহেতু বাংলাদেশের প্রবাসী জনশক্তির সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য, তাই সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বজায় থাকলে তা আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি
দেশের বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে অর্থমন্ত্রী বিগত সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, দুর্নীতি, লুটপাট এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্রভাড়ার নামে বিদ্যুৎ খাতের বিপুল অর্থ অপচয় করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্তের কারণে বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে যে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি হয়েছে, তা এখনো দেশের মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। আর এসব কারণেই বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও ভুল নীতির কারণে এখনো জনগণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার
সংকট ও অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী পরিকল্পনা ও সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অর্থমন্ত্রী জানান, খাতের সব পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিবিড় মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পাশাপাশি অদক্ষ ও পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ বা আধুনিকায়ন করা, সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং পূর্বের বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো পুনরায় পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন এবং সিস্টেম লস কমিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহকে আরও নির্ভরযোগ্য করার কাজ চলছে।
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে।
মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই মেগা প্রকল্পের প্রথম ইউনিট থেকে আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
আমদানি-নির্ভর জ্বালানি থেকে বের হয়ে আসতে হবে
এদিকে জ্বালানি খাতের সংকট কাটাতেও বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত সময়ে জ্বালানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত আমদানি-নির্ভরতা পুরো খাতটিকে একটি ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড় করিয়েছিল। সে সময় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, রিফাইনিং সক্ষমতা বা মজুদ বাড়ানোর কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তবে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল ও এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়লেও দেশের জনগণের স্বার্থে সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম সামান্য সমন্বয় করা হলেও গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে এবং এর মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। আগামী তিন বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে ২৭০ কিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন-কিলোমিটার ২ডি এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক জরিপ সম্পন্ন করা হবে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই সময়ের মধ্যে নতুন ৬৯টি কূপ খনন এবং ৩১টি পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার (মেরামত) করা হবে। পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান রিগ কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সমুদ্রাঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে পিএসসি কাঠামো সংশোধন করে নতুন করে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে।
জ্বালানি অবকাঠামোর বহুমুখীকরণ
জ্বালানি আমদানিতে একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার কৌশলগত বহুমুখীকরণ নীতি গ্রহণ করেছে। মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন আরও একটি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি এখন সরকারের পর্যালোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে।
দেশের অভ্যন্তরে ৬০১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার একটি নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
বক্তৃতার শেষে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই সমন্বিত ও সংস্কারমুখী উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে। এর ফলে দেশের মানুষ ও শিল্পকারখানায় তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।






