বেসরকারি ঋণ হ্রাসের চাপে বিনিয়োগে টান
- ঋণের লক্ষ্য ৮ দশমিক ৫ শতাংশ
- জানুয়ারিতে অর্জন ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ
- সরকারের ঋণ ছাড়িয়েছে লক্ষ্যসীমা
- ব্যাংকের সুদ ১৪-১৭ শতাংশ
- সরকারি বন্ড বিলের সুদ ১১-১৩ শতাংশ

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
সরকারি বন্ড বিলে বিনিয়োগ নিরাপদ বিবেচনায় অধিকাংশ ব্যাংক উদাসীনতা দেখাচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগে। এতে লক্ষ্যের দ্বিগুণ হয়ে গেছে সরকারের ঋণ। অথচ দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে হচ্ছে সংকোচন। নতুন কারখানা সৃষ্টি ও উৎপাদনের জন্য আমদানি করতে পারছে না চাহিদামতো কাঁচামাল। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। আর জানুয়ারিতে নেমেছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরেও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। সেই হিসাবে তুলনা করলে দেখা যায়, ধারাবাহিকভাবে কমছে ঋণপ্রবাহ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে একদিকে ব্যাংকঋণ দিতে দেখাচ্ছে উদাসীনতা। অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তারা চড়া সুদে নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত কার্যত চলছে ধীরগতিতে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ঋণের পরিমাণ বাড়লেও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে প্রবৃদ্ধির গতি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে ঋণ বেড়েছে এক লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ১১ শতাংশ। অথচ বেসরকারি খাতে চলতি অর্থবছরের ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সাড়ে ৮ শতাংশ।
আবার সরকারি ঋণের লক্ষ্য ছিল এক লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ইতিমধ্যে সেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। আর অর্থবছরের শেষ তিন মাসে সরকারি ঋণের লক্ষ্য ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ সুদহার ঋণ সংকোচনের অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে অনেক ব্যাংকের ঋণের সুদহার পৌঁছেছে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ঋণের খরচে। ফলে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন নতুন বিনিয়োগে।
এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং খেলাপিঋণের উচ্চ হার ঋণ বিতরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে খেলাপিঋণের হার প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকগুলোকে নিরুৎসাহিত করছে ঝুঁকি নিতে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংকের অর্জিত মুনাফার বড় অংশ এসেছে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ থেকে। এক বছর ধরেই সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার ১১-১৩ শতাংশ, যা দেখা যায়নি নিকট-অতীতে। এত উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের বড় অংশই ব্যবহার করছে সরকারকে ঋণ দেওয়ার কাজে। তাতে ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে সরকারের সুদ খাতের ব্যয়।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসি আই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ জানান, উচ্চ সুদহারে ব্যাংকঋণ নিয়ে কোনো শিল্প প্রকল্প লাভজনক করা কঠিন। এতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না, বরং বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই খাচ্ছেন হিমশিম। আবার ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট কমিয়ে দিয়েছে ঋণপ্রবাহ। খেলাপিঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশের বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে হয়ে পড়ছে অনাগ্রহী। প্রকৃত উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন না অর্থায়ন। ব্যাংকে টাকা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে না ঋণ। কারণ ঝুঁকি নিতে চাইছে না ব্যাংকগুলো।
ঋণ সংকোচনের অন্যতম বড় কারণ ডলার সংকট। ডলারের দাম ১২২ টাকার বেশি হওয়ায় বেড়েছে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যয়। এতে কঠিন হয়ে পড়েছে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া। বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছেন অনেক উদ্যোক্তা।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনশীলতা কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। ডলার সংকটও কমিয়ে দিয়েছে ঋণ চাহিদা। ডলারের বিনিময় হার বেশি হওয়ায় বেড়েছে কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয়। কমে গেছে নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ।
নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দেন অভ্যন্তরীণ বৈঠকে সুদহার কমানোর। ডাকা হয় মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকও। তবে তা স্থগিত করা হয় শেষ পর্যন্ত। মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের কারণে। তাই আপাতত সুদহার কমাবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ প্রাক্কলনের বিপরীতে অর্জিত হয় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে রাজনৈতিক সরকারের সময়ে বিনিয়োগ খরা কাটবে এমন প্রত্যাশা থেকে বাড়ানো হয়েছে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন।
‘পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চাহিদা নেই ঋণের। ব্যাংকগুলো এখন চেষ্টা করে যাচ্ছে ট্রেজারি খাতে বিনিয়োগ করে মুনাফা করার। এ ছাড়া অনেক ব্যাংক নজর বাড়িয়েছে ভোক্তা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি খাতের ঋণে। স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি হলে বাড়বে নতুন ঋণের চাহিদা। এ জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে ব্যাংকগুলোকেও। আমানত বাড়াতে দিতে হবে নজর।’ মত দেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

