২০২৫-এর শেষ প্রান্তিক
বিদেশি বিনিয়োগে ধাক্কা, কমেছে ১৮ শতাংশ

ফাইল ছবি
গত বছরের ডিসেম্বর প্রান্তিক (অক্টোবর-ডিসেম্বর) শেষে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ।
২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে নিট এফডিআই এসেছে ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ১৩ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার ডলার।
আজ বুধবার (৮ এপ্রিল) এ তথ্য জানা গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
নানা ধরনের অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগে এমন ধাক্কা, বলছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
জাহিদের ভাষ্য, গত বছর বিনিয়োগ করার মতো কোনো পরিবেশ ছিল না। কারণ সে সময় রাজনৈতিক সমঝোতা কোন দিকে যাবে, সেটারও নিশ্চয়তা ছিল না। তাই সে সময়ে বিদেশি ঋণ দেশে আসবে—এমনটা ভাবাই অবাস্তব। মূলত বিদেশি বিনিয়োগ আনতে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে এসব উদ্যোগ বাধার মুখে পড়ে। সে সময় দেশের পরিস্থিতি দেখে বাইরের কোনো বিনিয়োগকারী এখানে বিনিয়োগ করবে—এটা স্বাভাবিক নয়।
‘বিনিয়োগকারীরা জানত অন্তর্বর্তী সরকার স্থায়ী হবে না। আর নির্বাচন নিয়ে পরিষ্কার রোডম্যাপ ছিল না। নানা ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল—সামনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ ছিল। এসব কারণে কমেছে বিনিয়োগ’—যোগ করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই অর্থনীতিবিদ।
প্রতিবেদন বলছে, পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফাও (রিইনভেস্টেড আর্নিংস) কমেছে। এক বছরের ব্যবধানে এটি কমেছে ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে রিইনভেস্টেড আর্নিংস দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৩২ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার। রিইনভেস্টেড আর্নিংস বলতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কার্যক্রম থেকে অর্জিত মুনাফা, যা লভ্যাংশ হিসেবে বাইরে না পাঠিয়ে দেশে পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়। যদিও এটি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, প্রকৃত এফডিআই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের ওপর, যা এখনো রয়েছে দুর্বল।
‘দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিবেশ বিবেচনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো রিইনভেস্টেড আর্নিংস কমিয়েছে। কারণ সে সময় নির্বাচন হবে কিনা—এ নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল। যদিও ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয়েছে, তবে ওই প্রান্তিকে এ নিয়ে শঙ্কা ছিল’— মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
মোস্তাফিজুরের মতে, রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও নানা কাঠামোগত সমস্যার কারণে দেশে এফডিআই প্রবাহে বাধা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে নীতিগত জটিলতা, উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিরুৎসাহিত করেছে বিদেশি বিনিয়োগ।
সূত্র জানায়, বন্দর ব্যবস্থাপনায় পরিবহন ও লজিস্টিক সুবিধার সীমাবদ্ধতা, পাশাপাশি কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
‘দেশে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ কমেছে। এতে বোঝা যায়, দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নন, পাশাপাশি বিদেশিরাও নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকছেন’— মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
নীতিগত সমস্যাগুলো সমাধান না হলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে বলেও উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ইক্যুইটি, রিইনভেস্টেড আর্নিংস ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ—এই তিন উৎস মিলিয়ে দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৬ কোটি ৩৮ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার ছিল।
















