বিনিয়োগ বাড়াতে বদলাচ্ছে ‘অচলনীতি’
- বিনিয়োগে গতি ফেরাতে সরকারের বড় পদক্ষেপ
- একীভূত হচ্ছে ছয় প্রতিষ্ঠান
- পর্যালোচনায় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত
- থাকবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান
- সরকারি দপ্তরের কাজ দ্রুত নিষ্পত্তিতে চালু ‘ডি-নথি’

প্রতীকী ছবি
নড়চড় নেই বিনিয়োগে। একই নীতি দিনের পর দিন। এতে বিনিয়োগের পারদ নামছে তো নামছেই। এসব নিয়ম-নীতি সময়োপযোগী করতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়ানো মুখের কথা নয়। আছে এই ভাবনাটিও।
বিনিয়োগে জড়তা কাটাতে বড় ধরনের নীতি পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সম্প্রতি উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে এক করার সিদ্ধান্ত এসেছে বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট ৬টি সংস্থাকে। করে দেওয়া হয়েছে কমিটি। যাতে আইনি প্রক্রিয়াগুলো ঠিক করতে পারেন তারা। কার্যালয়ের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একাধিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধানদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়েছে চিঠি।
চিঠিতে অর্থ ও পরিকল্পনা এবং বাণিজ্য খাতের নীতি নির্ধারকদের পাশাপাশি যুক্ত করা হয় সংশ্লিষ্ট শীর্ষ সংস্থাগুলোকে। বৈশ্বিক সংকটের মুখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম জোরদার ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে নতুন সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে— এমনটি জানিয়েছেন চিঠি প্রাপ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।
চিঠি গেছে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার কাছে। এ ছাড়া চিঠি গেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, অর্থসচিব ও বাণিজ্য সচিবের কাছেও।
অবশ্য জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বৈশ্বিক সংকট ও আস্থাহীনতায় বিনিয়োগে খরা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কাজে আসেনি অন্তর্বর্তী সরকারের বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ। কারণ স্বল্প মেয়াদের ওই সরকারের নীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগের সাহস দেখায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিনিয়োগকারীদের ভাষ্য, ক্ষমতায় পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিমালাও কার্যকারিতা হারাতে পারে। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫৮ শতাংশ কম বিনিয়োগ আসছে। আরও বেশি খরার চিত্র ধরা পড়েছে বিদেশি বিনিয়োগে।
অর্থনৈতিক মন্দা ও বিনিয়োগের খরার মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি সরকার। তারেক রহমান বিনিয়োগ ইস্যুটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তার অগ্রাধিকার কয়েকটি কাজের মধ্যে। এই জায়গা থেকে সম্প্রতি উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে সভাপতিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে দীর্ঘদিনের বহাল কিছু জটিলতা কীভাবে কাটানো যায় সেই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা হয় সরকারি দপ্তরগুলোর ফাইল নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও।
বৈঠকে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা নিশ্চিতকল্পে দ্রুত ‘ডি-নথি’ চালু করার কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী)। আলোচনায় উঠে আসে বিনিয়োগ সেবাকে আরও সমন্বিত ও সহজ করতে ৬টি সংস্থাকে একীভূতকরণের প্রস্তাবও। সংস্থাগুলো হচ্ছে— বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বাহাটেপা), পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপি) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
বৈঠকে উপস্থিত সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন কোনো নীতির পরিবর্তন হয়নি। ফলে এই নীতিগত বড় পরিবর্তন হলে বিনিয়োগ খাতে জটিলতা দূর হওয়ার সঙ্গে এ খাতের খরা কাটবে এমন আশা করা হচ্ছে। তবে ৬টি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করার যৌক্তিকতা, আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সুপারিশ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দাখিল করতে এক মাসের সময় বেধে দেওয়া হয়েছে ওই কমিটিকে। বৈঠক থেকে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবকে।
সরকারের গঠিত কমিটি পর্যালোচনা করে জমা দেবে একটি প্রতিবেদন। সরাসরি বাস্তবায়ন করা হবে না ওই কমিটির সুপারিশ বা প্রস্তাব। সেটি বাস্তবায়নে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সংযুক্ত করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে।
নথিপত্র চলাচলে ধীরগতির বিষয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে। এতে ভোগান্তিও হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। এর প্রেক্ষিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নথি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘ডি-নথি’ চালুর নির্দেশনাও দেওয়া হয় সরকারি সব দপ্তরে। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয় মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে।
ডি-নথি (ডিজিটাল নথি) হলো সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার জন্য তৈরি একটি আধুনিক ডিজিটাল ফাইল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। এটি ই-নথির একটি উন্নত সংস্করণ, যা সহজতর করে মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফাইল তৈরি, অনুমোদন, ডাক ব্যবস্থাপনা ও নথিপত্র সংরক্ষণের কাজ।
‘সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে একীভূতকরণের কমিটি গঠন এবং কমিটির সুপারিশ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পর্যালোচনা এটি ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু এর মাধ্যমে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো খুব বেশি কাজে আসবে না। এটি দীর্ঘ মেয়াদে হতে পারে’— বলছিলেন সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ।
মাহবুবের মতে, চিহ্নিত করতে হবে বিনিয়োগ না বাড়ার কারণগুলো। সংস্কার আনতে হবে অনেকগুলো আইন কানুন ও নীতির। এ ছাড়া কিছু পদক্ষেপ সরকারের হাতে নেই। বৈশ্বিক সৃষ্টি যেমন যুদ্ধ এক ধরনের বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। এ অনিশ্চয়তাই বড় কারণ। এটি কাটাতে পারলে কিছুটা বাড়তে পারে বিনিয়োগ।
সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক চাপ, বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়াতে এ ধরনের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।















