দক্ষ কর্মী গড়তে না পারলে সুযোগ নেওয়া যাবে না

আবদুল হক
২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি গাড়ি রপ্তানি করবে জাপান। অন্যদিকে, জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতি বছর বাণিজ্য ঘাটতি ৮০ কোটি মার্কিন ডলার। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শ্রমবাজার গতিশীল করতে আগামীকাল জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরের মধ্য দিয়ে নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন জাপান-বাংলাদেশ চেম্বারের উপদেষ্টা এবং বারভিডা সভাপতি আবদুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী
প্রশ্ন: আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জাপান ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি গাড়ি রপ্তানি করবে। অন্যদিকে জাপানের সঙ্গে প্রতি বছর বাণিজ্য ঘাটতি হচ্ছে ৮০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্য দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতি আনতে প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর করছেন। এ সফরটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আবদুল হক: আমরা চাচ্ছিলাম তারা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করুক, যেমনটি তারা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামে করেছে। জাপান বিগত সময়ে আমাদের মেগা প্রজেক্টগুলোয়— যেমন মাতারবাড়ীতে পাওয়ার হাব, ডিপ সি পোর্ট, মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামোতে বড় রকমের সহায়তা করছে।
প্রশ্ন: টয়োটার বিনিয়োগের বিষয়ে কী ভাবছেন?
আবদুল হক: প্রধানমন্ত্রী টয়োটার সঙ্গে বিশেষ চুক্তি করার চিন্তা করছেন এবং টয়োটা বাংলাদেশে গাড়ি অ্যাসেম্বলিং করা দিয়ে শুরু করতে চায়। তবে আমাদের শুধু অ্যাসেম্বলিং নয়, ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে যাওয়া উচিত। কারণ শুধু অ্যাসেম্বলিং রপ্তানিকারক দেশকে সাহায্য করে, এতে রেভিনিউ ঘাটতি হয় এবং সাপ্লাই চেইন তৈরি হয় না।
প্রশ্ন: সরকার ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) বা বৈদ্যুতিক গাড়িকে শুল্ককর ছাড় দিচ্ছে, এটি কি কোনো চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে?
আবদুল হক: অবশ্যই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। কারণ প্রযুক্তিগত বিবর্তন হুট করে করা যাবে না, ব্রিটেনের মতো দেশও এটি পর্যায়ক্রমে করছে। বাংলাদেশের শুল্ককর অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ গাড়ি কিনতে পারে না। মধ্যবিত্ত শ্রেণি বড় করতে না পারলে অর্থনীতি বাড়বে না। সরকারের পলিসি টেকসই করতে বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
প্রশ্ন: জাপানে এখন কর্মক্ষম লোকের ঘাটতি আছে। সেখানে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য কোনো সম্ভাবনা দেখছেন কি?
আবদুল হক: জাপানে লোক যাচ্ছে, তবে সবটাই স্কিলড ম্যানপাওয়ার (দক্ষ জনশক্তি)। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিবিএ, এমবিএ তৈরি করা হচ্ছে; কিন্তু কারিগরি বা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী স্কিলড মানুষ গড়ে তোলা হচ্ছে না। দক্ষ মানুষ গড়ে তুলতে না পারলে এ সুযোগ নেওয়া যাবে না।
প্রশ্ন: জাপানের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কী পাবে? চুক্তির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক কোনো জটিলতা রয়েছে কি?
আবদুল হক: অনেক চুক্তি হয়েছে, যেগুলো কোনো আলোচনা ছাড়াই হয়েছে। ফলে দেশের ক্ষুদ্র মাঝারি ব্যবসাগুলো মারাত্মকভাবে মার খেতে পারে। জাপান নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখবে; কিন্তু আমরা আমাদের স্বার্থ পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছি কি না, সেটি প্রশ্নবোধক। এ ছাড়া দেশে অতীতে যে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা অলিগার্ক শ্রেণি তৈরি হয়েছিল, যারা অর্থ পাচার করে ব্যাংক সেক্টর খালি করেছে, নতুন সরকারকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রশ্ন: বৈদ্যুতিক গাড়িকে অগ্রাধিকার দিলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বাজার কি হুমকির মুখে পড়বে?
আবদুল হক: রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বিশাল ইকোসিস্টেম রয়েছে, যেখানে হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং বিশাল বিনিয়োগ জড়িত। বিগত ৫০ বছরে মানুষের জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৯০ শতাংশই রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। নতুন গাড়ি আসুক আপত্তি নেই; কিন্তু রিকন্ডিশন্ড গাড়িকে পলিসি দ্বারা দূরে ঠেলে দিলে সেটা আমাদেরই ক্ষতি হবে।
প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে বলে মনে করছেন?
আবদুল হক: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে আমরা জাপানের বিনিয়োগ পাব। জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ‘বিগ-বি’ নামে বে অব বেঙ্গলভিত্তিক যে উন্নয়নের রূপরেখা দিয়েছিলেন, বর্তমান সরকার মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে সেদিকেই যাচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চলকেও যুক্ত করা গেলে আঞ্চলিক রাজনৈতিক আধিপত্য কমে আসবে।



