বদলে যাচ্ছে অর্থবছর
বদলাবে উন্নয়নের মান, বাড়বে গতিও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘদিন আলাপ-আলোচনা ও যুক্তিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার সত্যিই বদলে যাচ্ছে অর্থবছরের গণনা। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমান জুলাই থেকে জুনের পরিবর্তে অর্থবছর আগামী ২০২৮-২৯ থেকে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ধরা হবে।
কিন্তু কেন এই পরিবর্তন, এর প্রভাবই বা কী— এ নিয়ে জবাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, এতদিন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু জুলাই মাস এবং শেষে জুন মাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বৃষ্টি ও বন্যার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতো। এখন আর তা করতে হবে না। শুষ্ক মৌসুমেই শুরু হবে কার্যক্রম। ফলে গতি বাড়বে উন্নয়নের। সার্বিকভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নে পড়বে ইতিবাচক প্রভাব।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, মার্চ মাসে শীতের আমেজ থাকে। ফলে সেসময় প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হলে সুবিধা হবে। এ ছাড়া বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী অর্থবছরের শুরুতে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাস মাঠে তেমন কাজ করা যায় না। এখন নতুন সময় অনুযায়ী সেই বিড়ম্বনা কেটে যাবে। পাশাপাশি অর্থবছর শেষে এডিপির বরাদ্দ একবারে অনেক টাকা খরচ করার যে কালচার তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে বের হয়ে আসার একটা পথ তৈরি হবে। অনেক উন্নত দেশও তাদের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে মিল রেখে অর্থবছর তৈরি করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের সাবেক এই সচিব বললেন, এতে ছোটখাটো কিছু সমস্যা হলেও সেটি গৌণ বিষয়। যেকোনো পরিবর্তন করতে গেলে কিছু না কিছু সমস্যা হবেই। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তে অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বেশি। এক্ষেত্রে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা নতুন অর্থবছরের সঙ্গে মিলিয়ে ওয়ার্কআউট করে নিলেই হয়ে যাবে।
সূত্র জানায়, অর্থবছরের নতুন সময়কাল বাস্তবায়ন শুরু হলে সরকারি পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় আসবে নতুন সময়সূচি। এ ছাড়া মানুষের জীবনে প্রতি বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব, করব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবেও পড়বে প্রভাব।
সরকারি ক্ষেত্রে যেসব কর্মসূচিতে বড় পরিবর্তন আসবে সেগুলো হলো— এখন জুন মাসে যে জাতীয় বাজেট ঘোষণা হয়, সেটি করতে হবে ফেব্রুয়ারিতেই। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ও প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), শুল্ক-কর, বিনিয়োগ, দেশি-বিদেশি ঋণসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ-লোকসানের হিসাব সময়সূচিতে বদল আসবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এই সংস্কারটির জন্য আমরা ১০-১৫ বছর ধরে বলে আসছিলাম। সরকারের এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। কেননা দেখা যায়, জুন মাসে এডিপির বরাদ্দ খরচ সবচেয়ে বেশি হয়। কিন্তু তখন বৃষ্টি-বাদল থাকায় কাজের মান নিশ্চিত হয় না। সেদিক থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে গেলে এরপর বৃষ্টি আর ঝামেলা তৈরি করতে পারবে না। অর্থবছরটি শুরু যদি হয় শুষ্ক সময়ে, তাহলে জুন-জুলাই— দুই মাস কাজ না হলেও সমস্যা হবে না। এক্ষেত্রে বলা যায়, সরকারের অর্থবছর পরিবর্তনের এই সংস্কারের ফলে বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা বাড়বে।’
পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়কাল ধরেই অর্থবছর হিসাব করা হয়। এর মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, ব্রাজিল, ফ্রান্স, কোরিয়া, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা অন্যতম। এ ছাড়া এপ্রিল টু মার্চ ধরে অর্থবছর হিসাব করা অন্যতম দেশ ভারত ও যুক্তরাজ্য। জুলাই টু জুন ধরে যেসব দেশ অর্থবছর হিসাব করে সেগুলোর মধ্যে পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও নেপাল অন্যতম। সূত্র জানায়, গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময় ধরে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের যাবতীয় হিসাবনিকাশ করা হবে। আর আগামী অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৭-২৮ অর্থবছর হবে ৯ মাসের।






