শ্রমিক আন্দোলনের মুখে বাধাগ্রস্ত ৮৫০ কোটির রপ্তানি

সংগৃহীত ছবি
টানা শ্রমিক আন্দোলনের মুখে মারাত্মক সংকটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। গত দুই দিনে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন স্তব্ধ হয়ে প্রায় ৮৫০ কোটি (৭ কোটি মার্কিন ডলার) টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আজ মঙ্গলবার থেকে সারা দেশের সব পোশাক কারখানা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ। তবে হামলা, ভাঙচুর ও সহিংসতার আশঙ্কায় কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে তাদের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, শুধু গতকাল সোমবারই ঢাকা, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলের ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল; যেখানে কাজ করা থেকে বিরত ছিলেন প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক। এক দিনেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ডলার বা ৫০০ কোটি টাকা। এর আগে গত রবিবার ৫২৯টি কারখানা বন্ধ থাকায় ব্যাহত হয় আরও ৩ কোটি ডলারের রপ্তানি। টানা এ স্থবিরতায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ, বিশ্ববাজারে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা এবং অতিরিক্ত বিমান-পরিবহন খরচের (এয়ার ফ্রেইট) আশঙ্কায় চরম দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি (অর্থ) মো. মিজানুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, সোমবার সকালে শ্রমিকরা কারখানায় এসে আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় ঢাকা ও আশপাশের অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। এতে প্রায় ৪ কোটি ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এটি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাহত হওয়া রপ্তানি কার্যক্রমের হিসাব। কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
শুধু উৎপাদন বন্ধ থাকাই নয়, এর প্রভাব পড়ছে কারখানার পরিচালন ব্যয় ও পণ্য সরবরাহের সময়সূচিতে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানিয়েছেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে সোমবার তার প্রতিষ্ঠানের দুটি কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ৪৫টি উৎপাদন লাইনের এই দুটি কারখানা পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার ডলার ব্যয় হয়। কারখানা চালু থাকুক বা বন্ধ থাকুক, এই নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে কারখানা বন্ধ থাকায় ওই দিনের পুরো ব্যয়ই প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
শোভন ইসলাম আরও বলেছেন, তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদন সূচিও ব্যাহত হয়েছে। পরে ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ ও জাহাজীকরণ নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় (ওভারটাইম) কাজ করিয়ে উৎপাদন ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এতে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত খরচ এড়াতে কারখানার মালিকরা সাধারণত অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য জাহাজীকরণের চেষ্টা করেন। ফলে চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
এদিকে, সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর মঙ্গলবার সারা দেশের সব পোশাক কারখানা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজিএমইএ। তবে কারখানা চালু রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা। তাদের ভাষ্য, ‘আগামীকাল (মঙ্গলবার) কী হয় দেখি’— এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে কারখানা পরিচালনা ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কারখানা চালুর আগে শ্রমিকদের এবং তাদের যাতায়াতের পথে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ চলমান সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক তৎপরতা ও কিছু ইউনিয়ন নেতার ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তাদের মতে, এসব অভিযোগ গোয়েন্দা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পুলিশের মনোবল দুর্বল বলেও মন্তব্য করেছেন তারা। শুধু বিজিবির উপস্থিতির ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে মাঠে থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিএমইএকে আরও দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেছেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা সংকটে দেশের পোশাক খাত তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে চলমান সহিংসতার কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়ছে কর্মসংস্থান। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাও দুর্বল হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে দৃঢ় ও আইনানুগ পদক্ষেপের মাধ্যমে কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
গত অক্টোবর মাসে দেশে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। সারা দেশে পোশাক কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১৩৪টি। চার দিন সাপ্তাহিক ছুটি ধরে ২৬ দিনে এই রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ কোটি ১৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি কার্যক্রম হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, ৬৭০টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় সোমবার প্রায় ৪ কোটি ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



