উৎপাদনে রেকর্ড, কপালের ভাঁজ সরছে না চাষিদের
- পান থেকে বছরে ২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা

ছবি: আগামীর সময়
স্বাদ ও মানের জন্য দেশ জুড়ে পরিচিত জিআই স্বীকৃত রাজশাহীর মিষ্টি পান একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক খাত। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এই পানকে ঘিরে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়। চাষি থেকে খুচরা ব্যবসায়ী— সবাই এই অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। তবে চলতি মৌসুমে পান উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্যের মধ্যেই অতিরিক্ত সরবরাহে দাম কমেছে। ফলে রেকর্ড উৎপাদনে পানের দরপতন হওয়ায় চাষিদের কপালে পড়েছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ।
চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ৫ হাজার ১৯ হেক্টর জমিতে ৮৭ হাজার ৫৫০ টন পান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ১০ হাজার টন বেশি। স্থানীয় বাজারদরে প্রতি কেজির গড় মূল্য ২৫০ টাকা হিসাবে পুরো উৎপাদনের বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। রাজশাহীতে মূলত দুধস্বর সাচি, মিষ্টি এবং সাচি পানের চাষ হয়। জেলার ৯টি উপজেলায় পানের বরজ থাকলেও মোহনপুর, বাগমারা ও দুর্গাপুর প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত বছর রাজশাহীতে ৪,৫০৯ হেক্টরে ৭৭,৪৫২ টন পান উৎপাদিত হয়। এক বছরে ৫১০ হেক্টর নতুন আবাদ যোগ হয়ে চলতি মৌসুমে তা ৫,০১৯ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪,৩৬১ হেক্টর জমিতে ৭৩,৭৭১ টন পান উৎপাদিত হয়। পরের বছর তা বেড়ে ৭৬,৬৭৮ টন হয়, যার আর্থিক মূল্য ছিল ১ হাজার ৯১৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। বর্তমান উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে। মোহনপুরের মৌগাছি, জাহানাবাদ ও ধুরাইল ইউনিয়নে বছরে কেনাবেচা হয় প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার পান।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে। প্রতি বিড়া উন্নতমানের পান ১০০, বড় ৩৫, মাঝারি ২০ এবং ছোট পান ৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন জানালেন, ৩২ বিড়া বা ২ হাজার ৪৮টি পানে ১ পোয়া হয়। বর্তমানে প্রতি পোয়া ছোট পান ২০০-২৫০, মাঝারি ৬০০-৮০০, বড় ১ হাজার ১ হাজার ২০০ এবং উন্নতমানের পান ২ হাজার ৫০০-৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের মতে, ১০ কেজি ওজনের ১ পোয়া পানের গড় মূল্য কেজিপ্রতি ২৫০ টাকা।
চাষি বদের উদ্দিন জানালেন, সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে। তিনি ১০ বিড়া বড় পান ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন। কৃষক গোলাম মোস্তফা বলেছেন, সার, কীটনাশক ও মজুরি বাড়লেও দাম পড়ায় লাভ কমে যাচ্ছে। পানচাষি সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় পান দ্রুত নষ্ট হয়, তাই কম দামে বেচতে হয়। মৌগাছির চাষি আলী হোসেন রিয়াদের মতে, বাজার ভালো থাকলে ১০ কাঠার বরজ থেকে বছরে ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা আয় সম্ভব।
মোহনপুর, দুর্গাপুর ও বাগমারার হাটগুলো থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় পান পাঠানো হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বললেন, ‘উৎপাদন বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও অতিরিক্ত সরবরাহে দরপতন ঘটছে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
কৃষি বিভাগের মতে, জিআই স্বীকৃতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও পানের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তবে সে সম্ভাবনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন আধুনিক সংরক্ষণ, উন্নত পরিবহন, প্যাকেজিং এবং নতুন বাজার সৃষ্টি। সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে মিলবে না এই সাফল্যের প্রকৃত সুফল।






