সম্পদের ওপর কর : বিনিয়োগবিরোধী এক ঝুঁকিপূর্ণ করনীতি

ফয়সাল ইসলাম
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সরকারের জন্য কর আদায় বৃদ্ধি করা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে রাজস্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু রাজস্ব বাড়ানোর পথ যদি এমন হয়, যা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, পুঁজি পাচার বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়, তাহলে সেই নীতির কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
সম্পদের ওপর কর আরোপের সাম্প্রতিক আলোচনা ঠিক সেই ধরনের এক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বের বহু দেশে ‘ওয়েলথ ট্যাক্স’ বা সম্পদ করের ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। বরং এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, পুঁজি বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে ফ্রান্স, সুইডেন, জার্মানিসহ অনেক দেশ শেষ পর্যন্ত এই ধরনের করনীতি থেকে সরে এসেছে।
কারণ খুবই সহজ। করের মূল নীতি হচ্ছে, আয়ের ওপর কর আরোপ করা। অর্থাৎ যেখানে প্রকৃত অর্থে আয় হয়েছে, নগদ প্রবাহ তৈরি হয়েছে কিংবা কোনো অর্থনৈতিক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে রাষ্ট্র কর নিতে পারে। কিন্তু সম্পদ মানেই সবসময় নগদ অর্থ নয়। এখন সেই ‘অপ্রাপ্ত’ বা ‘অবাস্তবায়িত’ সম্পদের ওপর কর বসানো হলে, তাকে হয় বাধ্য হয়ে উক্ত সম্পদ বিক্রি করতে হবে, নয়তো অন্য উৎস থেকে টাকা এনে কর দিতে হবে। অর্থাৎ কর পরিশোধের জন্যই সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অনেক পরিবারে পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া জমি রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য অনেক বেশি। কিন্তু জমি বিক্রি না করা পর্যন্ত সেই সম্পদ থেকে কোনো আয় তৈরি হয় না। এখন যদি সেই সম্পদের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়, তাহলে একজন মানুষকে শুধুমাত্র সম্পদ ধরে রাখার কারণেই প্রতি বছর নগদ অর্থ জোগাড় করে কর দিতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কতটা যৌক্তিক?
ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। একজন ব্যক্তি তার আয়ের ওপর পূর্বেই আয়কর পরিশোধ করেছেন। সেই কর-পরবর্তী সঞ্চয়ের ওপর আবার সম্পদ কর আরোপ করা হলে, কার্যত একই অর্থের ওপর দ্বৈত করের পরিস্থিতি তৈরি হবে। এ কারণেই আধুনিক অর্থনীতিতে অধিকাংশ সফল করব্যবস্থা ‘ইনকাম বেইজড’ এবং ‘ট্রানজ্যাকশন বেইজড’। অর্থাৎ আয় হলে কর হবে, বিক্রি হলে কর হবে, লেনদেন হলে কর হবে। কিন্তু লেনদেনই হয়নি, আয়ই আসেনি, অথচ কর দিতে হবে, এমন ধারণা বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই বাস্তবতা অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এর চেয়েও বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে বিনিয়োগ পরিবেশ। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অর্থপাচার ও হুন্ডি একটি বাস্তব সমস্যা। খুব কম খরচেই দেশের বাইরে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ এখনও বিদ্যমান। এই বাস্তবতায় যদি সম্পদের ওপর বাড়তি কর আরোপ করা হয়, তাহলে বড় বিনিয়োগকারী ও উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই তাদের সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে।
ফলে দেশে পুঁজি সঞ্চয়ের আগ্রহ কমবে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং অর্থনীতির ভেতরের মূলধন ধীরে ধীরে বিদেশমুখী হয়ে পড়বে। এতে লাভবান হবে বিদেশি অর্থনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, করনীতি কখনোই শাস্তিমূলক হওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্রের উচিত এমন একটি করসংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে সাধারণ মানুষ কর দিতে উৎসাহ বোধ করবে এবং বিনিময়ে দৃশ্যমান সেবা পাবে।
বাংলাদেশে এখনো বিপুল জনগোষ্ঠী সরাসরি আয়করের আওতার বাইরে। অথচ উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য করের ভিত্তি বিস্তৃত করা জরুরি। অল্প অল্প করের মাধ্যমে অধিকসংখ্যক মানুষকে কর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একজন স্বল্প আয়ের মানুষও যদি সামর্থ্য অনুযায়ী স্বল্প কর প্রদান করেন এবং বিনিময়ে স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, নাগরিক সুবিধা ও জবাবদিহিতা পান, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তার অংশগ্রহণ ও আস্থাও বাড়বে।
শুধুমাত্র উচ্চ আয়ের করদাতা এবং ধনীদের সম্পদকে লক্ষ্য করে করনীতি সাজানো দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নয়। কারণ বিনিয়োগ ও সম্পদ সৃষ্টি যদি নিরুৎসাহিত হয়, তাহলে কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় করব্যবস্থার সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সংস্কার হতে হবে বিনিয়োগবান্ধব, বাস্তবমুখী এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনাকে বিবেচনায় রেখে। সম্পদের উপর কর আরোপের মতো নীতিগুলো বাস্তবায়নের আগে সরকারের উচিত অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও কর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা করা। কারণ করনীতি কেবল রাজস্ব আদায়ের বিষয় নয়, এটি একটি দেশের বিনিয়োগ মনোভাব, অর্থনৈতিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করে।
বর্তমানে উচ্চ আয় এবং সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য বিদ্যমান সারচার্জ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। সেটিকে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করে, একই সঙ্গে করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ করনীতি গড়ে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য পথ।
লেখক: আর্থিক খাতের বিশ্লেষক
ইমেইল: [email protected]






