৬০ কোটি টাকার তিন সেতু অকেজো
- ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় হয়নি সংযোগ সড়ক
- শুষ্ক মৌসুমে ভরসা অস্থায়ী সেতু, বর্ষায় বাড়ে দুর্ভোগ

সংযোগ সড়ক না থাকায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা বাজারে ইছামতী নদীর ওপর নির্মিত সেতু- আগামীর সময়
সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ইছামতী, কালীগঙ্গা ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় তিনটি সেতু নির্মাণ করেছে সরকার। এ কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তবে সংযোগ সড়ক না থাকায় স্থানীয়দের কাজেই আসছে না সেতুগুলো।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে শেষ করা সম্ভব হয়নি সড়ক নির্মাণকাজ। ফলে সেতুগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত রয়েছেন স্থানীয়সহ আশপাশের এলাকার কয়েক লাখ মানুষ।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল কাদের জিলানীর দাবি, ঝিটকা সেতুর অবকাঠামো নির্মাণ শেষ। তবে ভূমি অধিগ্রহণ ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজ শেষ না হওয়ায় সংযোগ সড়ক নির্মাণ শুরুই করা যায়নি। প্রয়োজনীয় ভূমি বুঝে পেলেই শুরু হবে কাজ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতেই নির্মাণ করা হয়েছে এসব অবকাঠামো। কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় সেগুলো কার্যত অচল। তাদের প্রশ্ন, সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ ও ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ করতে কেন এত সময় লাগছে।
অবশ্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেছেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। জেলা প্রশাসনের কাছে জটিলতার কারণে আটকে নেই কোনো প্রকল্প। চলমান রয়েছে বৈকণ্ঠপুর ও জয়রা প্রকল্পের কাজ।’
হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা বাজারের পাশে ইছামতী নদীর ওপর পুরনো একটি সেতু রয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করায় নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দরপত্র আহ্বান করে সওজ বিভাগ। ১৯ কোটি ৬৭ লাখ ৩৪ হাজার ৫৩৮ টাকায় সেতুটির নির্মাণকাজ পায় ধ্রুব কনস্ট্রাকশন। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় সেতুর অবকাঠামো নির্মাণ। তবে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সংযোগ সড়কের কাজ করতে পারছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
প্রায় ৮০ শতাংশ ভূমির মালিক পেয়েছেন ক্ষতিপূরণের অর্থ। বাকি অর্থ পরিশোধও দ্রুত শেষ হবে -এস এম লুৎফর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী, এলজিইডি, মানিকগঞ্জ
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী সাগর আহমেদ বললেন, ‘সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য কিছু বালু ফেলা হয়েছিল। সড়কের জায়গায় রয়েছে বেশ কিছু দোকান। ভূমি অধিগ্রহণ ও দোকানগুলো উচ্ছেদ হলেই দ্রুত শেষ করা হবে সড়কের কাজ।’
আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে ঘিওর উপজেলার বৈকণ্ঠপুরে কালীগঙ্গা নদীর ওপর। ৩৬৫ মিটার সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২২ সালের জুনে সেতু ও সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। চার বছর পরও পুরোপুরি নির্মিত হয়নি সংযোগ সড়ক।
স্থানীয়দের মতে, সেতুটি চালু না হওয়ায় অন্তত ৩০টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। শুষ্ক মৌসুমে নৌকা বা অস্থায়ী কাঠের সেতু ব্যবহার করে পার হতে হয় নদী। বর্ষায় দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
স্থানীয় বাসিন্দা চঞ্চল মিয়ার ভাষ্য, শুষ্ক মৌসুমে কমে যায় নদীর পানি। তখন নৌকা বা কাঠের পাটাতন দিয়ে অস্থায়ী সেতু দিয়ে পার হতে হয়। তবে বর্ষায় ভোগান্তি পোহাতে হয় বেশি।
‘শুধু দুই পাশের সড়ক না থাকায় আমাদের চলাচল করতে হচ্ছে ভোগান্তি নিয়েই। জনগণের চলাচলের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করেই তো নির্মাণ করা হয়েছে সেতু। কিন্তু কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু হলেও চলাচল করা যাচ্ছে না। বেশি কষ্ট হয় নারী-শিশু ও বয়স্কদের’— বললেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, ভূমির মালিকদের অনেকেই পাননি ক্ষতিপূরণ। এ কারণে সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ চলছে ধীরগতিতে। সেতুর পূর্বপাশের বাসিন্দা তারা মিয়া জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগেই শেষ হয়েছে সেতুর কাজ। সংযোগ সড়কের কাজ শুরুর আগেই জমির মালিকদের টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টাকা না পাওয়ায় সবাই কাজে বাধা দেন। তিনিসহ বেশ কয়েকজন এখনো পাননি টাকা।
প্রায় ৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে সদর উপজেলার জয়রা এলাকায়। তবে এখানেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় শেষ হয়নি সংযোগ সড়কের কাজ।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালের বন্যায় মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড-বাংলাদেশ হাট সড়কের জয়রা এলাকায় মাটি সরে গিয়ে সৃষ্টি হয় গর্ত। পরে ওই সড়কে যানবাহন ও পথচারী চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হয় সেতু। সেতুর উত্তর পাশে নির্মাণ করা হয় মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সরু সেতু দিয়ে পারাপার হতে গিয়ে প্রতিদিনই দুই পাশে সৃষ্টি হয় যানজটের। এ পরিস্থিতিতে পুরনো সেতুর পশ্চিম পাশে নতুন আরেকটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। তবে কাজ শেষ হলেও জমির মালিকদের বাধায় নির্মাণ হয়নি সংযোগ সড়ক।
এলজিইডি মানিকগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম লুৎফর রহমান জানালেন, বৈকণ্ঠপুর সেতুর সংযোগ সড়কের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ বাবদ জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। এরই মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ভূমির মালিক ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছেন। বাকি অর্থ পরিশোধও দ্রুত শেষ হবে— আশা প্রকাশ করেন তিনি।






