নবাবগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি
সংস্কৃতির মঞ্চে মাদকের আসর
- উদ্বোধনের তিন বছরেও আয়োজন হয়নি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
- পরিকল্পনা ছিল সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার
- দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ
- সন্ধ্যা নামলে জড়ো হয় মাদকসেবী ও বখাটেরা

একদিন এ মঞ্চে শিশুদের আবৃত্তি শোনার কথা ছিল। নাটকের সংলাপে মুখর হওয়ার কথা ছিল সন্ধ্যা। রবীন্দ্রসংগীত, লালন কিংবা লোকগানের সুরে প্রাণ ফিরে পাওয়ার কথা ছিল পুরো চত্বর; কিন্তু বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির মুক্তমঞ্চে এখন আর সংস্কৃতির আলো জ্বলে না; সেখানে সন্ধ্যা নামলে জড়ো হয় মাদকসেবীরা। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সাংস্কৃতিককেন্দ্র আজ নীরবতা, অবহেলা আর ভাঙচুরের সাক্ষী।
কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবন, নাট্যচর্চা কেন্দ্র ও মুক্তমঞ্চ উদ্বোধনের তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে। নিয়মিত ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি এখন মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে সরকারি সম্পদ; ভেঙে ফেলা হয়েছে দরজা-জানালা, চুরি হয়েছে পানির মোটর, খুলে নেওয়া হয়েছে মুক্তমঞ্চের স্টেইনলেস স্টিল (এসএস) পাইপ।
স্থানীয় সূত্র বলছে, ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ উদ্বোধন করা হয় নবাবগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি ও মুক্তমঞ্চ। তবে উদ্বোধনের পর থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে আয়োজন করা হয়নি উল্লেখযোগ্য কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা, সাহিত্য, নাট্যচর্চা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল, সেটিই দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।
এর প্রভাব পড়ছে পুরো এলাকার সাংস্কৃতিক পরিবেশের ওপর। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, শিল্পকলা একাডেমি ও মুক্তমঞ্চ যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি এলাকার তরুণদের সুস্থ বিনোদন, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারত; কিন্তু দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় স্থানটি এখন পরিণত হয়েছে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়ে। তাদের মতে, একটি অঞ্চলের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ সেই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ অবকাঠামো দ্রুত সচল করা জরুরি।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের অভিযোগ, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যকর পরিচালনা কমিটি না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। ফলে ভবন, নাট্যচর্চা কেন্দ্র ও মুক্তমঞ্চের রক্ষণাবেক্ষণ যেমন ব্যাহত হয়েছে, তেমনি বন্ধ হয়ে গেছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও।
তাদের দাবি, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দ্রুত পরিচালনা কমিটি গঠন এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু করা হলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।
একই প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও। নবাবগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক এরশাদ আল মামুনের ভাষায়, ‘একটি অঞ্চলের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে শিল্পকলা একাডেমির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ নবনির্মিত শিল্পকলা একাডেমি ও মুক্তমঞ্চকে দ্রুত সচলের দাবি জানিয়েছেন তিনি। সংস্কৃতিকর্মীদের সম্পৃক্ত করে একটি কার্যকর পরিচালনা কমিটি গঠন করা হলে এ অঞ্চলের নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশের পথ আরও সুগম হবে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দ্রুত উদ্যোগও কামনা করেন তিনি।
স্থানীয়রা বলছেন, একটি অঞ্চলের উন্নয়ন শুধু সড়ক, সেতু বা ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; সেই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা। নবাবগঞ্জের শিল্পকলা একাডেমি ও মুক্তমঞ্চ এখন সেই বাস্তবতারই এক নীরব প্রতীক— যেখানে কোটি টাকার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। যে মঞ্চে একদিন করতালির শব্দ ওঠার কথা ছিল, সেখানে আজ শোনা যায় শুধু নীরবতার দীর্ঘশ্বাস।
অবশ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এর মধ্যে। নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলরুবা ইসলামের ভাষ্য, ‘শিল্পকলা একাডেমি সচল করার বিষয়ে একাধিকবার জানানো হয়েছে মহাপরিচালককে। ভবনের কেয়ারটেকার পুনর্বহালের জন্য করা হয়েছে আবেদন। একই সঙ্গে ভবনটি ব্যবহার উপযোগী করতে অর্থ বরাদ্দ চেয়েও পাঠানো হয়েছে আবেদন। পরিচালনা কমিটির অনুমোদনের জন্যও দুই দফা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’
দিলরুবা ইসলাম আশা করছেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে নবাবগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি চত্বর আবারও সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। সেখানে পূর্ণোদ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু করাও সম্ভব হবে।






