দেশজুড়ে খ্যাতি কুড়াচ্ছে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত লাল মাটির আনারস

যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজারজাতকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আনারস চাষ আবারও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। ছবি : আগামীর সময়
দেশজুড়ে খ্যাতি কুড়াচ্ছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত টাঙ্গাইলের লাল মাটির রসালো আনারস। তবে মধুপুরের লাল মাটিতে চলতি মৌসুমে ক্যালেন্ডার জাতের আনারস চাষে আশানুরূপ সাফল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে কম চাহিদা এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
বিপরীতে তুলনামূলক কম সময়ে ফলন আসা, অল্প জমিতে বেশি চারা রোপণ করা এবং বাজারে বেশি দাম থাকার কারণে জলঢুগি জাতের আনারস চাষে নতুন সাফল্য দেখছেন স্থানীয় চাষিরা।
তবে যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজারজাতকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আনারস চাষ আবারও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে জলঢুগি জাতের আনারসের চাষ সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া সঠিক পরিচর্যা ও সংরক্ষণে হিমাগার ব্যবস্থা থাকলে দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা মিটিয়ে এই আনারস বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব বলে আশা তাদের।
টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের লাল মাটিতে সুমিষ্টি স্বাদের আনারসের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। যার মধ্যে জলঢুগি জাতের আনারস চাষে বেশি ঝুঁকছেন চাষিরা। ক্যালেন্ডার জাতের আনারস ফল সংগ্রহের উপযোগী হতে প্রায় ১৮ মাস সময় লাগে।
অন্যদিকে জলঢুগি জাতের আনারস মাত্র ৮ মাসেই বাজারজাত করা সম্ভব হয়। এছাড়া বাজারে জলঢুগি আনারসের দাম ক্যালেন্ডার জাতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় এ জাতের চাষে লাভের সম্ভাবনাও বেশি। একই সঙ্গে জলঢুগি আনারস মিষ্টি ও সুস্বাদু হওয়ায় এর চাহিদাও অনেক।
গারো বাজারের আনারস চাষি আব্দুল লতিফ জানান, এবারে বিভিন্ন মৌসুমি ফল বাজারে আসায় আনারসের পাইকার বেশি পাচ্ছি না। দু-একজন যা পাওয়া যায় তারা ভালো দাম বলছে না।
চাষি আব্দুল লতিফ জানান, প্রায় ৩০০ শতাংশ জায়গায় তিনি জলঢুগি জাতের আনারস চাষ করেছেন। প্রতি বছরই ৪০০ থেকে ৫০০ শতাংশ জায়গায় চাষ করেন। এ বছর কলাবাগানের মাঝখান দিয়ে তিনি আনারসের বাগান করেছেন। ইতিমধ্যে ১০০ শতাংশের বাগান পাইকারি দরে প্রতিটি আনারস ২৭ টাকা করে বিক্রি করে দিয়েছেন।
হাবিব নামের আরেকজন কৃষক জানান, বর্তমানে বাজারে আম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলের সরবরাহ বেশি থাকায় আনারসের চাহিদা কিছুটা কমে গেছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ক্যালেন্ডার জাতের আনারসে লাভ কম হওয়ায় এখন সবাই জলঢুগি চাষের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
টাঙ্গাইল জেলায় এ বছর ৭ হাজার ৭৭৩ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হচ্ছে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে হিমাগার না থাকায় সংরক্ষণের অভাবে ফল নষ্ট হচ্ছে। তারা চেষ্টা করছেন যাতে দ্রুত একটি হিমাগারের ব্যবস্থা করা যায়। -কর্তৃপক্ষ
মধুপুরের লিটন সরকার নামের এক চাষির দাবি, আনারস সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা থাকলে ফল দ্রুত বিক্রির চাপ কমত। এতে কৃষকরা কিছুদিন ফল সংরক্ষণ করে বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বিক্রি করতে পারতেন এবং ন্যায্যমূল্য পেতেন।
অরণখোলা ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার লাল মিয়া বলেছেন, কৃষকরা মাঠে থেকে আনারস তুলে এনে মধুপুরের জলছত্র বাজারে বিক্রি করেন। এই বাজারে প্রতিদিন কোটি টাকার আনারস বিক্রি হচ্ছে। জলছত্র বাজার থেকে এই আনারস ট্রাক ও পিকআপে করে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রকিব আল রানা জানান, মধুপুরে মূলত তিন জাতের আনারস চাষ হয়ে থাকে। এগুলো হলো ক্যালেন্ডার আনারস, জলঢুগি আনারস এবং এমডি টু জাতের আনারস। এর মধ্যে জলঢুগি আনারসটি চার হাজার হেক্টরের অধিক জমিতে চাষ হচ্ছে।
‘ক্যালেন্ডার এবং এমডি টু আনারসের তুলনায় একই জমিতে জলঢুগি আনারসের চারা বেশি রোপণ করা যায়। ফলে ফলের দিক দিয়ে দ্বিগুণ লাভ করা সম্ভব। পাশাপাশি অল্প সময়ে এই ফল পাওয়া যায় বলেই কৃষকরা জলঢুগি আনারসের দিকে ঝুঁকছেন’, যোগ করেন এই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।
টাঙ্গাইলের খামারবাড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক শোয়েব মাহমুদ জানান, টাঙ্গাইল জেলায় এ বছর ৭ হাজার ৭৭৩ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হচ্ছে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে হিমাগার না থাকায় সংরক্ষণের অভাবে ফল নষ্ট হচ্ছে। তারা চেষ্টা করছেন যাতে দ্রুত একটি হিমাগারের ব্যবস্থা করা যায়। হিমাগার ব্যবস্থা থাকলে কৃষকরা ফল সংরক্ষণ করতে পারবেন। পরবর্তীতে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করে লাভবান হতে পারবেন।





