হাজারো খ্রিষ্টভক্তের প্রার্থনায় আলোকিত গারো পাহাড়

হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে পাহাড়ি পথে এগিয়ে চলেছেন হাজার হাজার মানুষ। ছবি : আগামীর সময়
মোমবাতির আলোয় আলোকিত গারো পাহাড়ের চূড়া। হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে পাহাড়ি পথে এগিয়ে চলেছেন হাজার হাজার মানুষ। কেউ এসেছেন মানত পূরণ করতে, কেউ পাপমোচনের প্রার্থনায়, আবার কেউ পরিবারের মঙ্গল ও দেশের শান্তি কামনায়।
শেরপুরের নালিতাবাড়ীর বারমারী সাধু লিওর খ্রিষ্টান ধর্মপল্লীতে দুই দিনব্যাপী ২৯তম বার্ষিক ফাতেমা রাণীর তীর্থোৎসবে দেখা মিলেছে এমনই আলোকিত পরিবেশ।
এ বছর ‘মানবতার জননী ফাতেমা রাণী মা মারিয়া’ প্রতিপাদ্যে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অংশ নেন দেশ-বিদেশের প্রায় ২০-৩০ হাজার রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টভক্ত। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এ তীর্থোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মোমবাতি হাতে আলোর শোভাযাত্রা।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে পূর্ণ মিলন, পাপ স্বীকার ও বিকেলে পবিত্র খ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। রাতে অনুষ্ঠিত হয় আলোর শোভাযাত্রা, আরাধনা, ব্যক্তিগত প্রার্থনা, নিরাময় অনুষ্ঠান ও নিশি জাগরণ।
প্রায় তিন কিলোমিটার পাহাড়ি ক্রুশের পথ পাড়ি দিয়ে তীর্থযাত্রীরা মা মারিয়ার প্রতিকৃতির সামনে সমবেত হন। সেখানে মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানান তারা। অনেকে নিজের ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। ভালো ফলাফল, পড়াশোনায় সাফল্য এবং মনের আশা পূরণের জন্যও মা মারিয়ার কাছে প্রার্থনা করেন ভক্তরা।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উপাসনার জন্য সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে ৪৮ ফুট উঁচু মা মারিয়ার মূর্তি। এটি দেশের সবচেয়ে বড় মা মারিয়ার মূর্তি বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আজ শুক্রবার সকালে জীবন্ত ক্রুশের পথ ও মহা খ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে দুই দিনের ধর্মীয় আয়োজন শেষ হয়।
ময়মনসিংহ ধর্মপল্লীর পালপুরোহিত বিশপ পনেন পল কুবি সিএসসি জানিয়েছেন, ১৯৪২ সালে ফাদার মার্কস বারমারী মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৮ সালে ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশ বারমারী মিশনকে ধর্মপল্লী হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে সেখানে ফাতেমা রাণীর তীর্থস্থান গড়ে তোলা হয়।
তিনি জানান, প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এ ক্যাথলিক তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এবারও আশার তীর্থযাত্রার মূল ভাবনা সামনে রেখে উৎসব উদ্যাপন করা হয়েছে।
বিশ্ব মানবতার কল্যাণের পাশাপাশি বাংলাদেশের শান্তি ও সব সমস্যার সমাধান কামনায় এবার প্রার্থনা করা হয়েছে। উৎসব আয়োজনে সহযোগিতার জন্য জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছেন বিশপ পনেন।
ঢাকা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তীর্থোৎসবে এসেছেন খ্রিষ্টভক্ত মনি মং। তিনি জানিয়েছেন, প্রতিবছরই এখানে আসেন। এবারও একটি মানত পূরণের আশায় মা মারিয়ার কাছে প্রার্থনা করতে এসেছেন।
তীর্থযাত্রী দামদা মানকিমের ভাষ্য, ধর্মীয় নিয়মনীতি যথাযথভাবে পালন এবং ভালো কাজের জন্য প্রার্থনা করতে তারা তীর্থস্থানে আসেন। মোমবাতি হাতে পুরো তীর্থস্থান ঘুরে মা মারিয়ার কাছে নিজেদের মনের আশা জানান। তার বিশ্বাস, মা মারিয়া তাদের মানত পূরণ করেন।
তীর্থযাত্রী কেয়া নকরেক দেশের সবার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেছেন। তিনি বলেন, মা মারিয়া তাঁদের মনের ইচ্ছা পূরণ করেন। এবারও মোমবাতি হাতে পাহাড়ি পথে হেঁটে নিজের পাপমোচন ও সবার শান্তির জন্য প্রার্থনা করেছেন তিনি।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, এ উৎসব দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ। হাজার হাজার খ্রিষ্টভক্তের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষও উৎসব দেখতে এসেছেন। শেরপুরের মানুষ শান্তিপ্রিয়। পূজায় কোনো ঝামেলা হয়নি। তীর্থোৎসবও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
তিনি আরও জানান, পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়েছিল। তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), এপিবিএন, বিজিবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, গ্রাম পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করেন।
শেরপুরের পুলিশ সুপার মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব সম্পন্ন করতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় বিজিবি সদস্যরাও নিয়মিত টহল দিয়েছেন। পাশাপাশি এপিবিএন মোতায়েন ও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা ছিল।




