এক হাত নেই, তবু অদম্য মাসুদ আজ অনুপ্রেরণা

ছবি: আগামীর সময়
জন্মের পর একটি শিশুকে ঘিরে বাবা-মায়ের কত স্বপ্ন! কিন্তু যখন দেখা গেল নবজাতকের একটি হাত নেই, তখন অনেকেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল—এই ছেলে বড় হয়ে কী করবে?
কেউ কেউ ভবিষ্যৎ নিয়েও হতাশার কথা শুনিয়েছিল। তবে একজন মানুষ কোনোদিন সেই কথাগুলো বিশ্বাস করেননি। তিনি ছিলেন তার মা। তার অটল বিশ্বাস ছিল, আমার ছেলে একদিন মানুষের জন্য কিছু করবে।
সময়ের পরিক্রমায় সেই মায়ের বিশ্বাসই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের আরিছপুর গ্রামের সন্তান আল-মাসুদ লোকমান জন্মগতভাবে বাম হাত ছাড়াই পৃথিবীতে আসেন। কিন্তু প্রকৃতি একটি হাত না দিলেও তাকে দিয়েছে অদম্য সাহস, অটুট আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় মনোবল এবং মানুষের জন্য বেঁচে থাকার বিরল মানসিকতা। তাই জীবনের প্রতিটি বাধাকে পায়ের নিচে ফেলে আজ তিনি হয়ে উঠেছেন শত শত শিশুর স্বপ্ন নির্মাতা, অসহায় মানুষের আশ্রয় এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯৯৫ সালের ১০ মার্চ জন্ম নেওয়া আল-মাসুদ লোকমান পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের পরিবারের একজন। ছোটবেলা থেকেই শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাকে সমাজের কটূক্তি, অবহেলা ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি হার মানেননি।
তালিবপুর আহছানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি, মনতলার শাহজালাল সরকারি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ল' কলেজে অধ্যয়নরত।
শিক্ষা অর্জনের পর নিজের জীবন গড়েই থেমে থাকেননি। তার বিশ্বাস ছিল, একটি শিক্ষিত প্রজন্মই পারে একটি সুন্দর সমাজ গড়তে। সেই বিশ্বাস থেকেই ২০১০ সালে বন্ধু মো. মনিরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড হাই স্কুল।
মাধবপুর উপজেলার সমজদিপুরে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি আজ এলাকার শিক্ষার অন্যতম আস্থার নাম। বর্তমানে সেখানে ৩৮২ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এবং ১৩ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মরত। অর্থাৎ তিনি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই গড়ে তোলেননি, বহু পরিবারের জীবিকারও ব্যবস্থা করেছেন।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়ে অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকেই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ পায়। অনেকের বই, খাতা ও স্কুল ড্রেসের খরচও বহন করা হয়, যাতে অর্থের অভাবে কোনো শিশুর শিক্ষা থেমে না যায়।
তার মানবিকতার পরিধি শুধু বিদ্যালয়ের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি অসংখ্যবার রক্তদান করেছেন, অসহায় ও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন। সমাজের বিত্তবানদের সম্পৃক্ত করে অন্তত ১০টি পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণে সহায়তা করেছেন। কারও ব্যবসার পুঁজি, কারও পড়াশোনার খরচ, আবার কারও জীবিকার ব্যবস্থা করে নীরবে মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তার মা। মানুষের অবহেলা যখন তাকে কষ্ট দিত, তখন মা বলতেন, আমার ছেলে একদিন মানুষের জন্য কিছু করবে।
কিন্তু ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সেই মাকে হারান তিনি। এরপর ২০২৩ সালের ১৩ জানুয়ারি হারান বাবাকেও। মা-বাবার শূন্যতা তাকে ভেঙে দিতে পারেনি; বরং তাদের স্বপ্ন ও দোয়াকেই জীবনের পথচলার শক্তি হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
এখনো তিনি বিয়ে করেননি। ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে সমাজ, শিক্ষা ও মানবসেবাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে নিজের সময় ও শ্রম উৎসর্গ করে চলেছেন নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার কাজে।
লোকমানের বড় ভাই আল-মুনসুর আবজাল বললেন, ছোটবেলা থেকেই লোকমান ধর্মপ্রাণ ও সমাজসেবামুখী। মানুষের উপকার করতে পারলেই সে বেশি আনন্দ পায়।
উত্তর সমজদিপুর গ্রামের ইমাম হোসেন জানালেন, আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। লোকমান ভাই আমাকে ব্যবসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আজ আমি পরিবার নিয়ে ভালো আছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাংগাইল গ্রামের এক নারী বললেন, আমার দুই মেয়ের প্রায় ১০ হাজার টাকার বই কিনে দিয়েছেন। তার সহযোগিতা না পেলে হয়তো ওদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে যেত।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুল ইসলাম জানালেন, লোকমানের কাছে মানুষই সবচেয়ে বড় সম্পদ। দরিদ্র শিক্ষার্থী ও অসহায় মানুষের জন্য সে সবসময় নিরলসভাবে কাজ করে।
আল-মাসুদ লোকমান যোগ করেন, আমার স্বপ্ন, নিজের এলাকার তরুণ প্রজন্মকে শুধু শিক্ষিত নয়, ন্যায়পরায়ণ, আদর্শবান ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আমি চাই, আমার মৃত্যুর পরও শিক্ষার এই অগ্রযাত্রা চলমান থাকুক।
মাধবপুর উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কবির হোসেন বললেন, আল-মাসুদ লোকমান শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সমাজে তার মতো মানুষ আরও প্রয়োজন।
একদিন যাকে দেখে অনেকে ভেবেছিলেন, তিনি কিছুই করতে পারবেন না—আজ সেই মানুষই শত শত শিশুর হাতে বই তুলে দিচ্ছেন, অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন এবং প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্নের বীজ বুনছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, সফলতার জন্য দুটি হাত নয়, প্রয়োজন একটি অদম্য মন, মানবিক হৃদয় এবং মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প।
মাধবপুরের মানুষের কাছে তাই আল-মাসুদ লোকমান শুধু একজন শিক্ষক নন; তিনি একজন স্বপ্নবাজ মানুষ, একজন মানবিক সমাজসেবক, একজন আলোকবর্তিকা। তার জীবন যেন নীরবে বলে যায়—শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি তার স্বপ্নের ডানা অটুট থাকে।




