১৩৫০ টাকার সার মিয়ানমারে পৌঁছালেই ৪০০০
- নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন রুটে রাতের আঁধারে যাচ্ছে ভর্তুকির সার
- পাচার হয় চাল, ডাল, পেট্রল, কেরোসিন ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীও
- এক কোটি টাকার ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকলে হয় চার কোটি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাত নামলেই নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি পথগুলোতে শুরু হয় ব্যস্ততা। ট্রাকে আসে বস্তাভর্তি ইউরিয়া সার। ভোর হওয়ার আগেই সেই সার বাঁশের ভারে কিংবা কাঁধে চেপে পৌঁছে যায় সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে। বিনিময়ে এপারে আসে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।
একসময় এই সীমান্ত দিয়ে চাল, ডাল, পেট্রল, কেরোসিন কিংবা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পাচারের অভিযোগ ছিল। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে কৃষকের জন্য সরকারের ভর্তুকিতে দেওয়া রাসায়নিক সার। অনুসন্ধানে এমন তথ্যই উঠে এসেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের রামু উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তের পাহাড়ি পয়েন্টগুলোতে পাচারের দৃশ্য অনেকটাই প্রকাশ্য। তবে এর মূল নিয়ন্ত্রণ সীমান্তের ভেতরে নয়, সমতলের কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনীয়া ও আশপাশের এলাকায়— এমন অভিযোগও রয়েছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি সদর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরের বামহাতির ছড়া। গ্রামের পাশের পাহাড় পেরোলেই মিয়ানমারের ফকিরা বাজার। স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দার দাবি, দেশে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় কেনা এক বস্তা ইউরিয়া বা টিএসপি সার সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দিতে পারলেই মিলছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা। বিপুল এই মুনাফার কারণেই সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ পাচারের ঝুঁকিতে জড়িয়ে পড়ছেন।
নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সভাপতি মাঈনুদ্দিন খালেদের ভাষায়, ‘এপার থেকে যাচ্ছে শত শত বস্তা সার, আর বাঁধভাঙা ঢলের মতো মিয়ানমার থেকে দেশে ঢুকছে ইয়াবা ও মদ।’
রাতের আঁধারে সার, ভোরের আগেই সীমান্ত পার
সরেজমিন দেখা গেছে, রাতের আঁধারে নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাচ্ছে ‘বিসিআইসি’ সিলযুক্ত সারের বস্তা। ভোরের আগেই সেগুলো বামহাতির ছড়াসহ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নেওয়া হচ্ছে।
রামু উপজেলার গর্জনীয়া বাজারের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের আলোতেও মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সার নেওয়া হচ্ছে দোছড়ি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী সড়কে। কোথাও কোথাও পাকা সড়ক ধরে ট্রাকেও পৌঁছে যাচ্ছে চোরাচালানের পণ্য।
স্থানীয়রা বলছেন, এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি চোখে পড়ে না। ফলে সরকারি ভর্তুকির সার সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখেও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
সার যাচ্ছে, আসছে ইয়াবা
সীমান্তের ওপার থেকে মাদক আসার একটি ঘটনাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। সম্প্রতি গ্যাস সিলিন্ডারে প্রায় ৭০ হাজার ইয়াবা নিয়ে এক অটোরিকশাচালক আটক হন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের ওই ইয়াবা বহনের জন্য চালককে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৩০ হাজার টাকা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মিয়ানমার থেকে এক কোটি টাকার ইয়াবা বাংলাদেশে ঢোকার পর এর বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় চার কোটি টাকা। ফলে মাদক ও সার দুই দিকের চোরাচালান ঘিরে গড়ে উঠেছে লাভজনক একটি সিন্ডিকেট।
সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের প্রভাবও এই চোরাচালানকে বাড়িয়ে দিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। তাদের ভাষ্য, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে থাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, জ্বালানি ও সার যাচ্ছে। বিনিময়ে মাদকসহ বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে ঢুকছে।
রামুর গর্জনীয়ায় ‘অঘোষিত বাফার স্টক’
সার পাচারের মূল উৎস কোথায়— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বারবার উঠে এসেছে রামুর গর্জনীয়া এলাকার নাম। নাইক্ষ্যংছড়ি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সভাপতি মাঈনুদ্দিন খালেদের দাবি, গর্জনীয়া এলাকায় গড়ে উঠেছে সারের একটি অঘোষিত ‘বাফার স্টক’। সেখান থেকে বিভিন্ন রুটে সার পৌঁছে যাচ্ছে সীমান্তে।
তবে স্থানীয় সার ব্যবসায়ীরা কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বান্দরবান জেলা সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী বাজারের সার ডিলার সিরাজুর রহমান সজলের দাবি, নাইক্ষ্যংছড়িতে প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে তিনি পেয়েছেন মাত্র ১৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া। তার অধীনে থাকা ৯ জন সাব-ডিলারসহ মোট ১০ জনের মধ্যে ভাগ করলে প্রত্যেকে পান প্রায় ২৮ বস্তা করে। তার প্রশ্ন—এত অল্প সার দিয়ে স্থানীয় কৃষকের চাহিদা মেটানোই কঠিন, সেখানে পাচার করার সুযোগ কোথায়?
তবে কৃষি বিভাগের একটি সূত্রের দাবি, সীমান্ত এলাকায় সার পাচার ঠেকাতে সরকারি নির্দেশনায় বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নামে-বেনামে সারের ডিও
অনুসন্ধানে সারের চালান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রামুর গর্জনীয়া বাজারের হান্নান এগ্রো ট্রেডার্সের মালিক আবু হান্নানের দাবি, তার প্রতিষ্ঠানের নাম ও মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে সম্প্রতি ১৬০ বস্তা বিভিন্ন ধরনের সার পরিবহনের ডিও ইস্যু করা হয়েছে। অথচ এসব সার পরিবহনের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
একইভাবে, গত ৬ সেপ্টেম্বর ৩০০ বস্তা সারবোঝাই একটি ট্রাক মরিচ্যা বিজিবি চেকপোস্টে আটক হয়। কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাগজপত্রে ওই সারের চালান ছিল অন্য এক ব্যবসায়ীর নামে। স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, এভাবেই প্রকৃত মালিক বা গন্তব্য আড়াল করতে নামে-বেনামে ডিও ও চালান ব্যবহার করে সীমান্তে সার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তদন্তের অভিযোগ, ফল কোথায়?
সার পাচারের সঙ্গে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ জড়িত— এমন অভিযোগও রয়েছে। কক্সবাজারের কচ্ছপিয়া ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও সার পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগের পর গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তাকে নিয়ে বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দাপ্তরিক কাজে রাখার কথা বলা হয়েছিল বলে কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়।
তবে কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক জানিয়েছেন, তিনি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন পাননি।
দুই ব্যাটালিয়ন বিজিবির পাহারায় শত কিলোমিটার সীমান্ত
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দীর্ঘ এই অংশ পাহারায় রয়েছে বিজিবির দুটি ব্যাটালিয়ন— ৩৪ ও ১১ নম্বর ব্যাটালিয়ন। মৈত্রী সেতু পয়েন্ট থেকে দোছড়ির পাইন্যাছড়া পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার সীমান্ত তাদের দায়িত্বের আওতায়। তবু এই দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে সার পাচারের অভিযোগ থামছে না। গত ৩ সেপ্টেম্বর ৪ হাজার ৪০১ কেজি ইউরিয়া সার আটক করে বিজিবি। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দফায় বিজিবি মোট প্রায় সাড়ে ৭ মেট্রিক টন সার আটক করেছে।
৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেছিলেন, সারসহ কৃষি উপকরণ পাচার দেশের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ কারণে সীমান্তে সরকার নিয়ন্ত্রিত পণ্য পাচার ঠেকাতে বিজিবি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে রয়েছে। কিন্তু আটকের এই পরিসংখ্যানের বাইরে সীমান্তের বিভিন্ন পথে প্রতিদিন কত সার চলে যাচ্ছে, তার হিসাব নেই।
কোন পথে যাচ্ছে সার
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের নয়াপাড়া, তুমব্রু, জলপাইতলী, বাইশফাঁড়ি, সোনাইছড়ির রেজু, সদর ইউনিয়নের চাকঢালা ও চেলির ছান এবং দোছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে পাচারের কাজে। কোথাও পাহাড়ি পথ, কোথাও সীমান্তঘেঁষা পাকা সড়ক— রুট বদলালেও গন্তব্য একই, মিয়ানমারের ওপারে।
কারা এই চক্রের মূল হোতা, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে নাইক্ষ্যংছড়ি ও রামুর কিছু মানুষ অস্বাভাবিকভাবে সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাদের আয় ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করলে সার ও মাদক পাচারের নেপথ্যের চক্রের সন্ধান মিলতে পারে।



