খুলনায় এলজিইডির সড়ক
নামেই সংস্কার, আসলে অপচয়!
- ছয় বছরে ব্যয় ১২৪৭ কোটি
- ৯ উপজেলায় চলাচলের অনুপযোগী ১০৬ কিমি
- সড়কে সড়কে ধস
- দুর্ভোগ-ভোগান্তিতে গ্রামীণ জনপদের মানুষ

প্রতীকী ছবি
দুর্ভোগ কমাতে ১১ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছিল খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কসংলগ্ন কৈয়াবাজার থেকে মহানগরীর রায়েরমহল স্লুইসগেট পর্যন্ত ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়ক। কিন্তু কাজ শেষ হতে না হতেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে কৈয়াবাজারসংলগ্ন অংশ। আর এক বছরের মধ্যে পুরো সড়কই চলাচলের অনুপযোগী। মাঝে অবশ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে ফের সংস্কার করা হয় সড়কটি। কিন্তু চলতি বর্ষায় এটিতে আবারও সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত।
শুধু এ সড়কই নয়; খুলনার ৯টি উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধিকাংশ সড়কের চিত্র একই। তিন বছরের টেকসই থাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই কোনো সড়কে কার্পেটিং উঠে খোয়া বের হয়ে গেছে, কোনো সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে ছোট-বড় খানাখন্দ, আবার কোথাও তৈরি হচ্ছে ডোবা। এ ছাড়া পুকুর, নালা, মৎস্য ঘেরের পাশে থাকা অনেক সড়ক ধসে পড়ছে জলাশয়ে। প্রতি বছর বিপুল টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার ও নির্মাণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাচ্ছেন না গ্রামীণ জনপদের মানুষ।
সড়কটি ব্যবহারকারীরা বলছেন, সংস্কারে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও পাশে প্যালাসাইডিং না দেওয়ায় বেহাল হয়ে পড়ছে সড়কগুলো। তবে এলজিইডির দাবি, এর দায় আছে সাধারণ মানুষেরও। সড়ক থেকে ১০ ফুট জায়গা ছেড়ে পুকুর ও ঘের খননের আইন থাকলেও তা কেউ মানছেন না। ফলে বর্ষায় ভাঙনের কবলে পড়ছে সড়ক।
এলজিইডির তথ্য বলছে, বিগত ছয় অর্থবছরে জেলার নয়টি উপজেলায় সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে ১ হাজার ২৪৭ কোটি ৫৫ লাখ ২১ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় করেছে খুলনা এলজিইডি। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০৪ কোটি ৫০ লাখ ২১ হাজার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯০ কোটি ৪৪ লাখ ৩০ হাজার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৩০ কোটি ১৫ লাখ ২৪ হাজার ৭৫০, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২২৫ কোটি ৩০ লাখ ১৫ হাজার ৯৫০, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৯৪ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২০৩ কোটি ১৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে।
উপজেলাগুলোতে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হলেও এখনো চলাচলের অনুপযোগী ১০৬ কিলোমিটার সড়ক। খুবই খারাপ সড়কের মধ্যে রয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলায় ২৫ কিলোমিটার, দাকোপে ৫ কিলোমিটার, বটিয়াঘাটায় ১০ কিলোমিটার, দিঘলিয়ায় ১৩ কিলোমিটার, পাইকগাছায় ৮ কিলোমিটার, ফুলতলায় ১৫ কিলোমিটার, তেরখাদায় ৫ কিলোমিটার, রূপসায় ১৫ কিলোমিটার এবং কয়রায় ১০ কিলোমিটার। ফলে সড়কে সড়কে করুণ এ দুর্দশার কারণে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষদের যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহনে পড়তে হচ্ছে দুর্ভোগে।
ভোগান্তির বিষয়ে রূপসা উপজেলার নৈহাটি গ্রামের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান চৌধুরী ও আব্দুল হালিম বলেছেন, রূপসা-বাগেরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের কর্ণপুর থেকে ইলাইপুর মোড় এবং খুলনা-মোংলা মহাসড়কের মধ্যের সংযোগ সড়কটি নির্মাণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমানে সড়কে দেড় ফুট পর্যন্ত গভীর গর্ত রয়েছে। এ কারণে চলতি বর্ষা মৌসুমে সড়কটিতে ভ্যান-রিকশা এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও আসতে চায় না। এতে রোগী পরিবহন ও ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতে সাংঘাতিক অসুবিধা হচ্ছে। অনেক সময় গাড়ি চলাচল করতে গেলেই উল্টে পড়ে। ঝুঁকি নিয়ে বড় ধরনের কিছু যানবাহন চলাচল করছে।
দিঘলিয়া উপজেলার আড়ংঘাটা মোড়ের ওষুধ ব্যবসায়ী আহাদ আলী জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে আড়ংঘাটা মোড় থেকে মহসিন মোড় পর্যন্ত সাড়ে ৩ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করা হয়। কিন্তু সংস্কারের মাত্র এক বছরের মধ্যেই বিটুমিন ও খোয়া ওঠে গর্তের সৃষ্টি হয়। গর্তগুলো বড় হতে হতে এখন সড়কটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে ভোগান্তির পাশাপাশি ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
এ ছাড়া জেলার নয় উপজেলায় এলজিইডির আওতাধীন ২ হাজার ৪১১ কিলোমিটার কার্পেটিং সড়কের অধিকাংশের গা ঘেঁষে রয়েছে নালা-পুকুর, ডোবা, দিঘি, মৎস্যঘের। কিন্তু নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না রাখায় জলাশয়ে ধসে পড়ছে লাগোয়া অনেক সড়ক। যেমন- তিন মাস আগে ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে শেষ হয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলার বালিয়াখালী বাজার-হামকুড়া-থুকড়া বাজার সড়ক নির্মাণকাজ। সড়কটিতে নিয়মিত ভ্যানগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন মো. রফিকুল ইসলাম গাজী। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, সড়কটি নির্মাণে শুরু থেকেই বড় অনিয়ম হয়েছে। নিচে নিম্নমানের খোয়া, কাদা ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে। ওপরে পিচের স্তর পাতলা দেওয়া হয়েছে। সড়কের পাশের জলাশয়ে ধস ঠেকাতে প্যালাসাইডিং দেওয়া হয়নি। ফলে সড়কের কয়েকটি স্থানের বড় অংশ জলাশয়ে ধসে পড়েছে। শুধু এই সড়ক নয়, খুলনা-শাহাপুর সড়ক, গাবতলা-মলমলিয়া-ডুমুরিয়া সড়ক, কৈয়াবাজার-শরাফপুর সড়কের অনেক জায়গার বড় অংশ জলাশয়ে ধসে পড়েছে বলে জানালেন তিনি।
কয়েকটি উপজেলায় যানবাহনের চালকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানিয়েছেন, কিছু কিছু সড়কের অর্ধেক জলাশয়ে ধসে পড়েছে, যে কারণে কৃষিপণ্য ও যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিতে গাড়ি চালাতে হয়। রাতে অপরিচিত চালকরা অনেক সময় গাড়ি নিয়ে জলাশয়ে পড়ে যান।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা আগামীর সময়কে বলেছেন, সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে সড়ক নির্মাণ করছে না এলজিইডি। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের যোগসাজশে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে। নির্মাণকাজ সঠিক মনিটরিং করা হয় না। যেনতেন কাজ করে ঠিকাদার বিল তুলে নিচ্ছে। যে কারণে সড়কের মান খারাপ হচ্ছে। কিন্তু সড়ক টেকসই না হওয়ায় জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতেও।
সড়ক ধসে পড়া প্রসঙ্গে এলজিইডি খুলনার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী এস এম হাসান ইবনে মিজান বলেছেন, আইনে আছে, সড়ক থেকে ১০ ফুট জায়গা ছেড়ে পুকুর ও ঘের খনন করতে হবে; কিন্তু এ নিয়ম কেউ মানছেন না। অন্যদিকে সড়কের পাশে জলাশয়ে প্রটেকশনে অনেক খরচ। ফলে বরাদ্দস্বল্পতায় সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের সময় সব জায়গায় প্যালাসাইডিং ধরা সম্ভব হয় না। তারপরও প্যালাসাইডিং বা প্রটেকশনের বিষয়টি খেয়াল রেখেই এস্টিমেট প্রস্তুতে জোর দেওয়া হবে বলে জানালেন তিনি।
সড়ক টেকসই না হওয়ার কারণ সম্পর্কে খুলনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম সরদার বলেছেন, অধিকাংশ সড়কে সোল্ডার নেই, অনেক সড়কের দেড় থেকে দুই ফুট নিচে গ্রাউন্ড ওয়াটার টেবিল, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে গ্রাউন্ড ওয়াটার টেবিল আরও ওপরে উঠে আসছে। এ ছাড়া ধারণক্ষমতার বেশি মালপত্র নিয়েও ট্রাক ও লোহার চাকার ট্রাক্টর চলাচল করছে। মূলত এসব কারণেই সড়কের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে, টেকসই হচ্ছে না। তবে খুব খারাপ সড়ক মেরামতে এরই মধ্যে ৪২টি স্কিমে ৬০ কিলোমিটারের টেন্ডার হয়েছে।



