দিনে মহাসড়কে, রাতে ঘরে—ডাকাত আতঙ্কে কক্সবাজার

ছবি: আগামীর সময়
দুপুরের ব্যস্ত মহাসড়ক। টেকনাফ থেকে কক্সবাজারমুখী যাত্রীবাহী বাস। হঠাৎ পাহাড় থেকে নেমে আসে মুখোশধারী একদল অস্ত্রধারী। মহাসড়কে পেরেক লাগানো গাছ ফেলে বাসের গতি থামিয়ে যাত্রীদের জিম্মি করে ডাকাতি। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ডাকাতদের ছোড়া গুলিতে আহত হন এক যাত্রী।
স্থানীয়দের দাবি, বিকাশ কোম্পানির তিন বিক্রয় প্রতিনিধির কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা লুট করে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায় ডাকাতরা।
আজ রবিবার দুপুর পৌনে দুইটার দিকে টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়কের দমদমিয়া ১৪ নম্বর সেতুর কাছে বিজিবির চেকপোস্ট থেকে অল্প দূরে সংঘটিত এ ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়।
গত দুই মাসে কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্রের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গভীর রাতে গ্রিল কেটে ঘরে প্রবেশ, পুলিশ পরিচয়ে দরজা খুলিয়ে পরিবারকে জিম্মি করা, সিসিটিভির হার্ডডিস্ক খুলে নেওয়া এবং মোটরসাইকেলে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার মতো একই কৌশলে ঈদগাঁও, পেকুয়া, চকরিয়া, রামু ও টেকনাফে একের পর এক ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
দিনেদুপুরে মহাসড়কে সশস্ত্র ডাকাতি
স্থানীয় সূত্র জানায়, পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা ১০ থেকে ১২ জনের মুখোশধারী ডাকাত আগে থেকেই মহাসড়কে পেরেক লাগানো গাছ ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করে। টেকনাফ থেকে কক্সবাজারগামী ‘পালকি’ পরিবহনের একটি বাস সেখানে পৌঁছালে অস্ত্রের মুখে সেটির গতিরোধ করা হয়। বাসে থাকা বিকাশ কোম্পানির তিনজন বিক্রয় প্রতিনিধি হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের এজেন্টদের কাছে ব্যবসায়িক লেনদেনের নগদ টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন।
ভুক্তভোগী আব্দুল করিমের দাবি, তার তিনজন প্রতিনিধির কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা লুট করা হয়েছে।
ডাকাতদের হামলায় বিক্রয় প্রতিনিধি মো. আরমান (২৪) ছুরিকাঘাতে আহত হন। ধস্তাধস্তিতে আহত হন সাকিব (২১) ও একরাম (২২)। তিনজনই টেকনাফ পৌরসভার বাসিন্দা। খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছে যৌথ অভিযান শুরু করে।
টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বললেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে যৌথ অভিযান চলছে।
ঈদগাঁওয়ে এক সপ্তাহে পাঁচ ডাকাতি
মহাসড়কের এই ঘটনার আগেই ঈদগাঁও উপজেলায় এক সপ্তাহে পাঁচটি বড় ডাকাতির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গত ৩০ জুলাই দিবাগত রাতে ইসলামাবাদ ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য নুরুচ্ছফার বাড়িতে গ্রিল কেটে প্রবেশ করে ১০-১২ জনের সশস্ত্র ডাকাত দল। ঘরে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় তার স্ত্রী ও এক শিশুকে জিম্মি করে নগদ ২১ লাখ টাকা, প্রায় ৫০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোনসহ বিপুল পরিমাণ মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী।
একই রাতে পাশের পশ্চিম পোকখালী এলাকায় মো. হোছনের বাড়িতেও একই কায়দায় ডাকাতি হয়। সেখান থেকে ১৬ ভরি স্বর্ণ, সাড়ে তিন লাখ টাকা, মোবাইল ফোন এবং ৮০ লাখ টাকার একটি চেক নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২৩ থেকে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে ঈদগাঁও উপজেলায় পাঁচটি সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সংঘটিত হয়েছে চারটি।
পেকুয়ায় পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতি
পেকুয়ায় ডাকাতরা ব্যবহার করছে আরও কৌশলী পদ্ধতি। ভুক্তভোগী ইউপি সচিব রেজাউল করিম জানিয়েছেন, গভীর রাতে কয়েকজন নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে আলমারি ভেঙে প্রায় ১৫ ভরি স্বর্ণ, ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা, তিনটি মোবাইল ফোন এবং সিসিটিভির হার্ডডিস্ক নিয়ে পালিয়ে যায়।
একই উপজেলার টইটং ইউনিয়নে সৌদি প্রবাসী আমির হোসেনের বাড়িতে গ্রিল কেটে ঢুকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করা হয়। উত্তর মেহেরনামায় একটি ফাঁকা বাড়ির তালা ভেঙে প্রায় ১১ ভরি স্বর্ণ ও পাঁচ লাখ টাকার বেশি নগদ অর্থ নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
রামুতেও এক রাতে চার বাড়িতে হানা
সংঘবদ্ধ ডাকাতদের দৌরাত্ম্য থেকে রেহাই পায়নি রামুও। গত ৫ জুলাই ভোরে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চেইন্দা ঘোনারপাড়া সংলগ্ন মাকপাড়া এলাকায় ১০ থেকে ১২ জনের একটি সশস্ত্র দল শামসুল আলম, বজল আহমদসহ অন্তত চারটি বাড়িতে একযোগে ডাকাতি চালায়। দেশীয় অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান মালামাল লুট করে তারা পালিয়ে যায়। কয়েকজন আহতও হন।
ঘটনার আগের সন্ধ্যায় একই এলাকায় রামু থানা পুলিশের উদ্যোগে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সভার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংঘটিত ডাকাতির ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
চকরিয়াতেও একই ছক
চকরিয়ার বিভিন্ন ঘটনাতেও একই ধরনের কৌশল দেখা গেছে। কখনো পুলিশ পরিচয়ে, কখনো ওয়ারেন্টের আসামি খোঁজার কথা বলে বাড়িতে প্রবেশ করে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়েছে পরিবারের সদস্যদের। এরপর নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান মালামাল লুট করে পালিয়েছে সংঘবদ্ধ দল। একটি ঘটনায় ডাকাতরা পালানোর সময় একটি মোটরসাইকেল ফেলে গেলেও মূল চক্র এখনো ধরা পড়েনি।
চলতি বছরের ৮ জুন মাতামুহুরী উপজেলায় সংঘটিত এক ডাকাতির ঘটনায় মা ও মেয়ের ওপর যৌন সহিংসতার অভিযোগ দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
একই কৌশল, একই চক্র
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণে কয়েকটি মিল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ ঘটনা গভীর রাতে সংঘটিত হয়েছে। জানালার গ্রিল কেটে ঘরে প্রবেশ করা হয়েছে। কোথাও পুলিশ পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে। অপরাধীরা আগে থেকেই পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও অর্থসম্পদের বিষয়ে ধারণা রেখেছে। অনেক ঘটনায় সিসিটিভির হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আবার প্রায় সব ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত গাড়িতে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেছে তারা।
এসব কারণে স্থানীয়দের ধারণা, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একই সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্র সক্রিয় রয়েছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন
কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে জেলায় ডাকাতির ঘটনা ৪টি, দস্যুতা ৩টি, চুরি ১৭টি, হত্যা ১২টি এবং ধর্ষণের ঘটনা ১৭টি। জুলাই মাসে ডাকাতি ১টি, দস্যুতা ৪টি, চুরি ২৫টি, হত্যা ১৪টি, নারী ধর্ষণ ৮টি এবং শিশু ধর্ষণ ১১টি।
তবে ভুক্তভোগী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের দাবি, বাস্তবে সংঘটিত ডাকাতির সংখ্যা পুলিশের পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।
তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ডাকাতির ঘটনাকে চুরির মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে, আবার কিছু ঘটনা চুরির মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। ফলে অপরাধের প্রকৃত চিত্র সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেছেন, একের পর এক সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনায় সন্ধ্যার পর থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে, নতুন করে সিসিটিভি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়াচ্ছে। কিন্তু তাতেও স্বস্তি ফিরছে না।
তার মতে, সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্রগুলোকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী খোকার ভাষ্য, একই ধরনের কৌশলে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সমন্বিতভাবে তদন্ত করে বিশেষ অভিযান চালানো করা জরুরি। অন্যথায় কক্সবাজারে রাতের আতঙ্কের সঙ্গে দিনের মহাসড়কও নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে উঠবে।






