বন্ধুত্বের টানে হেলিকপ্টারে গাজীপুরে সৌদি নাগরিক, মুগ্ধ আতিথেয়তায়

আব্দুর রহমান সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হন দুপুরের খাবারের আয়োজনে। ছবি : আগামীর সময়
দূরত্ব কিংবা দেশের সীমারেখা যে কখনো মানুষের ভালোবাসার কাছে বাধা হতে পারে না, তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখা গেল গাজীপুরের কালীগঞ্জে। ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা ভুলে কেবল বন্ধুত্বের টানে হাজার মাইল দূরের দেশ সৌদি আরব থেকে সাত দিনের সফরে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন আব্দুর রহমান মোবারক আল ইয়ামি নামের এক সৌদি নাগরিক।
গ্রামবাংলার সবুজ প্রকৃতি, মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তায় মুগ্ধ এই বিদেশি অতিথি এখন মজেছেন দেশি ফল আর মাছের স্বাদে।
গতকাল শনিবার সকালটা কালীগঞ্জের মানুষের কাছে ছিল একটু অন্য রকম। গ্রামের সরু পথ, সবুজে ঘেরা জনপদ আর সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বসিত অপেক্ষার মধ্য দিয়ে যেন এক টুকরো আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের গল্প নেমে এসেছিল এই জনপদে।
এর আগে গত শুক্রবার বিকালে উপজেলার জাঙ্গালিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে হেলিকপ্টারে চড়ে আব্দুর রহমান অবতরণ করলে মুহূর্তেই মাঠজুড়ে উৎসুক মানুষের ঢল নামে। এর আগে এদিন তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে হেলিকপ্টারে উড়াল দেন।
এদিন রাতে সৌদি অতিথি তার বাংলাদেশি বন্ধু ইসমাঈল হোসেনের বাড়িতে অবস্থান করেন। পরদিন শনিবার সকাল থেকে শুরু হয় কালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সৌহার্দ্য ও আতিথেয়তার এক অনন্য পর্ব।
তিনি একই উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের দেলোয়ার হোসেন শেখ, জামালপুর ইউনিয়নের আশাদুল্লাহ এবং বাহাদুরশাদী ইউনিয়নের ঈশ্বরপুর গ্রামের নুর ইসলামের বাড়িতে যান। প্রতিটি স্থানেই তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা, তোরণ নির্মাণ এবং আন্তরিক অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।
বাঙালি সংস্কৃতির চিরচেনা অতিথি আপ্যায়নের অংশ হিসেবে তাকে ডাব, কলা, আপেল, কমলা এবং মৌসুমি দেশি ফল আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ও তালের শাঁস দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।
আব্দুর রহমান সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হন দুপুরের খাবারের আয়োজনে। দেলোয়ার হোসেন শেখের বাড়িতে তার জন্য পরিবেশন করা হয় দেশীয় ঐতিহ্যবাহী সব খাবার। দুপুরের ভোজে ছিল দেশি টেংরা, শিং, কৈ, মলা, পুঁটি ও চিংড়ি মাছ, দেশি মুরগির মাংস, খাসির মাংস ও গরুর মাংস। দুপুরের খাবার শেষে তিনি কাছের একটি লিচুবাগানে গিয়ে গাছ থেকে লিচু পেড়ে খান এবং শৈশবের মতো আনন্দ উপভোগ করেন।
সৌদিপ্রবাসীদের পরিবারগুলোর কাছেও এই সফরটি ছিল এক আনন্দের উপলক্ষ। দেলোয়ার হোসেন শেখের পিতা বরুজ শেখ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমার দুই ছেলে ও মেয়ের জামাই সৌদি আরবে থাকেন। আমাদের বাড়িতে সৌদি আরব থেকে এমন অতিথি আসায় আমরা খুবই আনন্দিত ও গর্বিত।’
অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে সৌদি নাগরিক আব্দুর রহমান মোবারক আল ইয়ামি বললেন, ‘আমার বন্ধু ইসমাঈল হোসেনের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছি। বাংলাদেশ সম্পর্কে যতটা ধারণা করেছিলাম, বাস্তবে এ দেশ তার চেয়েও অনেক সুন্দর। এখানকার মানুষ অত্যন্ত উদার ও অতিথিপরায়ণ। বন্ধুর বাড়িতে এসে আমার মনে হয়েছে এটি আমার নিজের বাড়ি, আর সে আমার আপন ভাই। সুযোগ পেলে আবারও এখানে আসব।’
বন্ধুত্বের এই সফর কেবল বাড়ি ঘোরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শনিবার বিকালে জাঙ্গালিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জাঙ্গালিয়া জায়ান্টস ক্লাব আয়োজিত দেড় লাখ টাকা পুরস্কারের একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আব্দুর রহমান।
গাজীপুর জজ কোর্টের এপিপি গাজী শাহ মোহতাশেম আজমল সোহেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করেন জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মোল্লা। রোমাঞ্চকর ওই ম্যাচে ট্রাইবেকারে পুবাইল বাজার স্পোর্টিং ক্লাবকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় পিরুজালী ফুটবল একাদশ। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন পিরুজালী ফুটবল একাদশের গোলরক্ষক তুহিন, যার হাতে পুরস্কার তুলে দেন এই সৌদি নাগরিক।
কালীগঞ্জের পর্ব শেষ করে রবিবার (৩১ মে) সকালে আব্দুর রহমান মোবারক আল ইয়ামি কুমিল্লা ও সিলেটের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে তার আরও দুই বাংলাদেশি বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যাবেন তিনি। ভ্রমণ শেষে আবারও কালীগঞ্জে ফিরে এসে তিনি নিজ দেশ সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হবেন।









