কক্সবাজার
বন্যায় ভেঙেছে ঘর, ডুবেছে জীবিকা

ডুবে গেছে ঘরবাড়ি নৌকায় করে যাচ্ছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। ছবি: আগামীর সময়
কয়েক দিনের বন্যায় কক্সবাজারে বদলে গেছে হাজারো মানুষের জীবন। কোথাও কাদা আর পলির নিচে চাপা পড়েছে ধানের ক্ষেত। কোথাও ভেসে গেছে মাছের ঘের। আবার অনেক পরিবার হারিয়েছে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও।
কৃষক, মাছচাষি থেকে দিনমজুর, সবার জীবনেই নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। কক্সবাজারজুড়ে এখন বন্যার ক্ষত আর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন লড়াই।
চকরিয়ার কৃষক মো. গফুরের জমিতে এখন কেবল কাদা আর পলির স্তূপ। কয়েক সপ্তাহ আগে যেখানে সবুজ আউশ ধানের চারা দুলছিল।
ভেঙে পড়া ঘেরের পাড়ে দাঁড়িয়ে হিসাব মেলাতে পারছেন না পাশের গ্রামের মাছচাষি শাহাবুদ্দিন। কয়েক ঘণ্টার স্রোতে হারিয়ে গেছে তার ১০ লাখ টাকার মাছ।
উখিয়ার হলদিয়াপালংয়ের গৃহবধূ ইসমত আরা দুই সন্তান নিয়ে বসে ছিলেন ভাঙা টিনের ঘরের পাশে। মাথার ওপর ছাদ নেই, ঘরে খাবার নেই, সামনের পথ অজানা। এই তিনটি দৃশ্য কেবল তিনটি পরিবারের নয়, এ যেন এবারের বন্যায় বিধ্বস্ত গোটা কক্সবাজারের প্রতিচ্ছবি।
টানা ৯ দিনের অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় জেলার জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০টি উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা। বন্যায় সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি পরিবার ও ২৪ লাখেরও বেশি মানুষ। প্রাথমিক হিসাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, মাঠপর্যায়ের বিস্তারিত যাচাই শেষে আরও বাড়তে পারে এই ক্ষতির পরিমাণ।
এখন পর্যন্ত বন্যা ও পাহাড় ধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৩১ জনে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ধসে ১৯ জন, পানিতে ডুবে ৮ জন, দেয়ালধস ও নৌকাডুবিতে ২ জন। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মারা গেছেন ১৫ জন।
গত ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে মাতামুহুরী, বাঁকখালীসহ নদ-নদীর পানি একসঙ্গে বাড়তে বাড়তে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ভাঙে বেড়িবাঁধ, ডুবে যায় গ্রামীণ সড়ক, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বহু জনপদ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে উখিয়া, চকরিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, সদর ও পেকুয়া উপজেলায়। অনেক এলাকায় কয়েকদিন বিদ্যুৎ ছিল না, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়।
বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে বসতভিটায়। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে জেলার ৬৬৮টি ঘর। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ১৫ হাজার ৮৫০টি। পানিতে নষ্ট হয়েছে খাদ্যশস্য, আসবাব, কাপড়, শিক্ষাসামগ্রী ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র। পানি নেমে গেলেও অনেক ঘরে জমে আছে কাদা, কোথাও দেয়াল ধসে গেছে, কোথাও উড়ে গেছে টিনের চালা। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরেও ঘরে ফেরা সম্ভব হচ্ছে না অনেক পরিবারের পক্ষে।
দীর্ঘমেয়াদি সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে কৃষি খাতে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হাজার ৪০১ একর ফসলি জমি। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৪৩ হাজার ২১০ জন। সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয়েছে ৬ হাজার ৪৭২ একর আউশ ধান, ৯১৪ একর আমনের বীজতলা, ২ হাজার ৩৫৯ একর শাকসবজি ও ৪১০ একর পান বরজ। চকরিয়ায় সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১০৩ একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে, তারপর কুতুবদিয়া, পেকুয়া, রামু, মহেশখালী, সদর, ঈদগাঁও ও উখিয়া।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. বিমল কুমার প্রামানিক আগামীর সময়কে বলেছেন, আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আগামী মৌসুমের উৎপাদনেও। দ্রুত বীজ, সার ও প্রণোদনা দেওয়া হবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের।
মৎস্য খাতেও বড় বিপর্যয়। জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ঘের। ভেসে গেছে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩ লাখ ৫৬ হাজার পোনা ও ২২১ লাখ পোস্ট লার্ভা। এ খাতে ক্ষতি ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি উখিয়ায়, তারপর মহেশখালী, চকরিয়া, মাতারবাড়ী, টেকনাফ ও সদর। নতুন করে শুরু করবেন কীভাবে—সেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন ঋণ নিয়ে মাছচাষ করা শত শত খামারি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা আগামীর সময়কে বলেছেন, মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন। সহায়তা দেওয়া হবে বরাদ্দ এলে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট, সেতু ও প্রতিরক্ষা বাঁধ। কোথাও রাস্তা ধসে গেছে, কোথাও সেতুর সংযোগ বিচ্ছিন্ন। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত। নলকূপ প্লাবিত হওয়ায় সুপেয় পানির সংকটে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ ঝুঁকি বেড়েছে পানিবাহিত রোগের। বহু বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় ব্যাহত হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রমও।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান আগামীর সময়কে জানান, ৪ থেকে ১১ জুলাই আট দিনে রেকর্ড হয়েছে জেলায় ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। এরমধ্যে ৫ জুলাই একদিনেই ২৪০ মিলিমিটার। বৃষ্টি ছিল ১২ জুলাইও। সোমবার সকাল থেকে পরিষ্কার হতে শুরু করে আকাশ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, কক্সবাজারে এ ধরনের অস্বাভাবিক বৃষ্টি এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে দ্রুত বাড়ছে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি। পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, খাল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ আরও জটিল করেছে পরিস্থিতি।
আইনজীবী মীর মোশারফ হোসেন টিটু আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘তাৎক্ষণিক ত্রাণ যেমন জরুরি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানও প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন, কৃষকদের বীজ ও সার, মাছচাষিদের পোনা ও খাদ্য, স্বল্পসুদে ঋণ, সড়ক-বাঁধ সংস্কার, নদী-খাল পুনঃখনন এবং পাহাড় সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী খোকা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার সঙ্গে পরিচিত কক্সবাজার। তবে এবারের দুর্যোগ প্রমাণ করল—জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পাহাড় ধ্বংস ও খাল দখলের সম্মিলিত প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে।’
তার ভাষ্য, ‘৮৯০ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি। কিন্তু যে স্বপ্ন ভেঙেছে, ঋণের বোঝা বেড়েছে, শিশুদের পড়াশোনা থেমে গেছে, আর কৃষক-মাছচাষিরা শূন্য থেকে শুরু করতে বাধ্য হচ্ছেন। তার মূল্য কোনো পরিসংখ্যানে ধরা সম্ভব নয়। নামতে শুরু করেছে বন্যার পানি। কিন্তু কক্সবাজারের মানুষের সামনে এখন শুরু হয়েছে পুনর্গঠন, পুনর্বাসন ও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আরও কঠিন এক সংগ্রাম।’







