হাউজ বোটে সৌন্দর্য হারাচ্ছে হাওর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
টাঙ্গুয়ার হাওরের নীল জল, বিস্তীর্ণ জলাভূমি আর নীরব প্রকৃতির টানে ছুটে আসেন পর্যটকরা। সেই সৌন্দর্য উপভোগের বাহন এখন বিলাসবহুল হাউজ বোট। কিন্তু পর্যটক নিয়ে নির্ধারিত নৌপথ এড়িয়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের বুক চিরে চলছে এসব নৌযান। জ্বালানি সাশ্রয়ের এই পথ বেছে নিতে গিয়ে হাওরের পানি ও জীববৈচিত্র্যে পড়ছে চাপ। হাউজ বোট থেকে ফেলা কাচের বোতল ও অন্যান্য বর্জ্যও শুকনো মৌসুমে কৃষকদের জন্য তৈরি করছে বাড়তি ঝুঁকি। পরিবেশ রক্ষার কথা থাকলেও পর্যটন মৌসুমে বছরের পর বছর এভাবেই চলছে হাউজ বোট। এসব বোটই হাওরের বুকে রেখে যাচ্ছে ক্ষতির আঁচড়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাহিরপুরের বড়দল গ্রামের মেশিনবাড়ি এলাকা দিয়ে হাউজ বোটগুলো মাটিয়ান হাওরে ঢোকে। এরপর হাওরের মাঝ বরাবর এগিয়ে যায় টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। অথচ হাউজ বোট চলাচলের জন্য মাটিয়ান হাওরের চারপাশে রয়েছে নৌপথ। নির্ধারিত পথ ব্যবহার করলে হাওরের বিস্তীর্ণ জলাভূমির ভেতর দিয়ে নৌযান চালানোর প্রয়োজন পড়ে না।
হাওরের মাঝ দিয়ে হাউজ বোট চলাচলের অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয়রা বলছেন জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা। নদীপথে ঘুরে যেতে হলে বেশি সময় ও জ্বালানি লাগে। সেই খরচ কমাতেই অনেক হাউজ বোট সরাসরি হাওরের বুক দিয়ে চলছে। এতে স্বল্প মেয়াদে জ্বালানি খরচ কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব পড়ছে হাওরের পরিবেশের ওপর।
বড়দল গ্রামের আসকর আলী হাউজ বোট চলাচলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেছেন, ‘এসব হাউজ বোট নষ্ট করছে হাওরের পরিবেশ। ধান চাষের সময় জমিতে শুধু কাচের বোতল পাওয়া যায়। এসব বোতলের কারণে অনেকের হাত-পা জখম হচ্ছে।’
হাওরের অগভীর পানির মধ্য দিয়ে বড় নৌযান চলাচলে তলদেশের মাটি ও জলজ উদ্ভিদে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাদের। হাউজ বোটের পরিবেশগত প্রভাব শুধু চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটকদের আরাম দিতে কোনো কোনো হাউজ বোটে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যবস্থা চালু রাখতে প্রায় সারাক্ষণ চালাতে হয় জেনারেটর। ফলে হাওরের নীরব পরিবেশে যুক্ত হচ্ছে জেনারেটরের শব্দ, পাশাপাশি ধোঁয়ার কারণে তৈরি হচ্ছে বায়ুদূষণ।
হাওরে পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে রয়েছে এর ইতিবাচক প্রভাবও। পরিবেশবিদরা মনে করেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যদি হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
সুনামগঞ্জ জনউদ্যোগের আহ্বায়ক সুখেন্দু সেনের ভাষায়, ‘আগে ভাবতে হবে বাণিজ্য, নাকি পরিবেশ। তবে পরিবেশের ক্ষতি না করে দুটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে পর্যটন পরিচালনা সম্ভব।’
তার ভাষ্য, ‘পরিবেশকে গুরুত্ব না দিয়ে একতরফাভাবে চলছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। চলাচল করছে শত শত হাউজ বোট, কোনো কোনো নৌযানে রয়েছে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও।’ হাওরের নির্মল প্রকৃতি দেখতে আসা পর্যটকদের জন্য এমন অতিরিক্ত বিলাসিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সুখেন্দু সেন মনে করেন, হাউজ বোট হাওরের মাঝ দিয়ে চলাচল করলে স্বাভাবিকভাবেই পানি, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর পড়বে বিরূপ প্রভাব। হাওরের পরিবেশ রক্ষা, স্থানীয় মানুষের স্বার্থ এবং পর্যটনের বিষয়গুলো সমন্বয় করে প্রশাসনের কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।
তবে হাউজ বোট মালিকদের সংগঠন বলছে, তাদের আওতাধীন কোনো হাউজ বোট মাটিয়ান হাওরের মাঝ দিয়ে চলাচল করে না। হাউজ বোট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আরাফাত হোসাইন আখন্দের দাবি, তারা নদীপথ ঘুরেই পর্যটকদের ওয়াচ টাওয়ার, শহীদ সিরাজ লেক ও যাদুকাটা নদীতে নিয়ে যান।
প্রশাসন অবশ্য বলছে, হাওরের মাঝ দিয়ে হাউজ বোট চলাচল ঠেকাতে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেছেন, ‘হাউজ বোট মালিকদের বলা হয়েছে হাওরের মাঝ দিয়ে চলাচল না করার জন্য। পর্যটকদের নিয়ে চলতে হবে নির্ধারিত নদীপথে। এজন্য বাঁশ ও লাল পতাকা দিয়ে নৌপথ চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। পানি বেশি থাকায় এতে কিছুটা সময় লাগছে। শুকনো মৌসুমে চিহ্নিত করে দেওয়া হবে নৌপথ, যাতে হাউজ বোটগুলো অবাধে হাওরের মাঝ দিয়ে চলাচল করতে না পারে।’






