আগামীর সময়

খোয়াই প্রকল্পে লুটপাটের শঙ্কা

খোয়াই প্রকল্পে লুটপাটের শঙ্কা

একটি নদী পুনরুদ্ধারে অত্যধিক ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে ঘন মিটার প্রতি পুনঃখনন ব্যয় ধরা হয়েছে চলমান একই প্রকৃতির অন্য প্রকল্পের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। ফলে এই বাড়তি অর্থ নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ‘পুরাতন খোয়াই নদী পুনরুদ্ধার’ প্রকল্পের প্রস্তাবে ঘটেছে এমন ঘটনা। বিষয়টি ধরা পড়েছে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনায়। এটি নিয়ে শিগগির অনুষ্ঠিত হবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় সভায় অতিরিক্ত ব্যয় এবং কোন ক্ষেত্রে অযৌক্তিক ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ সোমবার আগামীর সময়কে বলছিলেন, এমন প্রকল্পে ঘন মিটার প্রতি খনন খরচ ১০০-২০০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। ঠিকাদারের লাভসহ ধরলেও সর্বোচ্চ ২২০ টাকা করে পড়বে। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্পে সাড়ে ৪০০ টাকা বেশি ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই লুটপাটের শঙ্কা আছে। হয়তো লুটপাটের উদ্দেশ্যেই এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের উচিত কঠোরভাবে বিষয়টি দেখা। প্রয়োজনে যারা এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত তাদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে শাস্তির সুপারিশ করতে পারে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। প্রক্রিয়াকরণ শেষে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পের আওতায় হবিগঞ্জ জেলা সদরে অবস্থিত পুরাতন খোয়াই নদীর পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। সেই সঙ্গে ৪ কিলোমিটার পুনঃখননের মাধ্যমে নদীটিকে পুনরুদ্ধার করা হবে। পাশাপাশি দুই পাড়ে ৩ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে তৈরি, দুটি রেগুলেটর নির্মাণ এবং ৩টি ব্রিজ নির্মাণের পর পুরো এলাকাকে পর্যটন ও অবকাশ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, নদী পুনঃখনন কাজে প্রতি ঘন মিটার মাটি পুনঃখনন বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬৬ টাকা ৩৩ পয়সা করে। এটিকে অত্যধিক বলে মনে করেছে কমিশন। এক্ষেত্রে সমজাতীয় চলমান ও সমাপ্ত প্রকল্পের প্রতি ঘন মিটার পুনঃখনন কাজের ব্যয়ের তুলনামূলক একটি চিত্র তুলে ধরবে পরিকল্পনা কমিশন। যেখানে বলা হয়েছে, পুরাতন খোয়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে যেখানে ঘন মিটার প্রতি পুনঃখনন ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৬৬ টাকার বেশি, সেখানে হবিগঞ্জ জেলার বিবিয়ারা বিদ্যুৎ কেন্দ্রসমূহের সম্মুখে কুশিয়ারা নদীর উভয়তীরের প্রতিরক্ষা প্রকল্পে ধরা হয়েছে ১৭৪ টাকা ০৫ পয়সা করে। এছাড়া সিলেট জেলার সিলেট সদর ও বিশ্বনাথ উপজেলার দশগ্রাম, মাহতাবপুর ও রাজাপুর পরগনা বাজার এলাকা সুরমা নদীর উভয় তীরের ভাঙন থেকে রক্ষা প্রকল্পে ধরা হয় ১৯৩ টাকা ১১ পয়সা করে।

প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় এসব বিষয়ে প্রশ্নে মুখে পড়বেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। বলা হয়, নদী খননকৃত স্থান (জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন), নকশা, পরিমাপ (প্রস্থ ও গভীরতা) উল্লেখসহ খনন করা স্থানের তালিকা ডিপিপিতে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে এর যৌক্তিকতার বিষয়েও জানতে চাওয়া হবে। প্রকল্প প্রস্তাবে ২টি (২ ভেন্ট) রেগুলেটর নির্মাণ বাবদ ১৭ কোটি ৩৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি ৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ধরা হয়। এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে সভায়। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ৩টি ব্রিজ নির্মাণ বাবদ ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। কিন্তু অ্যালোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী এ কাজ স্থানীয় সরকার বিভাগের হওয়ায় প্রস্তাবিত প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া সুপারিশ দেওয়া হতে পারে।

প্রকল্প প্রস্তাবে ৩ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ কাজ বাবদ ৬ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা (মিটার প্রতি ২০ হাজার ৫৫০) টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এটিও স্থানীয় সরকার বিভাগের কাজ হওয়ায় প্রকল্প থেকে বাদ দিতে বলা হয়েছে। ডিপিপিতে ৩১০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ বাবদ ৯৭ লাখ ৩৭ হাজার (প্রতিটির জন্য ৩১ হাজার ৪০৯ টাকা) টাকা সংস্থান রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ এর তফসিল-১ এর লাল শ্রেণিভুক্ত প্রকল্প। অর্থাৎ এটি পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩-এর বিধি-৫ ও ১৫ অনুসারে প্রকল্পটির অনুকূলে অবস্থানগত ছাড়পত্র, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং এনভারমেন ইমপ্যাক্ট অ্যাসমেন্ট (ইআইএন) করা প্রয়োজন। কিন্তু এগুলো করা হয়নি। সভায় বলা হবে, প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার বর্তমান অবস্থার ভিডিও ও স্থিরচিত্র দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসস্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তার সঙ্গে৷ তিনি জানাচ্ছিলেন, প্রকল্প প্রস্তাবে নানা অসঙ্গতি আছে। পিইসিতে সব বিষয় তুলে ধরা হবে। সন্তোষজনক উত্তর না পেলে রেট সিডিউল অনুযায়ী কাটছাঁট করে ব্যয় নির্ধারণ হবে। সেই সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা ধরায় জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা বলা হবে।

প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, হবিগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এই জেলার প্রধান নদীগুলোর মধ্যে খোয়াই অন্যতম। খোয়াই নদী ভারতের ত্রিপুরা হতে উৎপত্তি হয়ে বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট, শায়েস্তাগঞ্জ, হবিগঞ্জ সদর ও লাখাই উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে পতিত হয়েছে। পরবর্তীতে তা কালনী নদী হয়ে আপার মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে।

এই নদীটি এক সময়ে ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট প্রশস্ত এবং ২৫ থেকে ৪০ ফুট গভীর ছিল। বন্যা থেকে হবিগঞ্জ শহর রক্ষার জন্য ১৯৭০ সালের শেষ দিকে নদী খনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় খোয়াই নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহপথ পরিবর্তন করে শহরের বাইপাস দিয়ে নতুন প্রবাহপথ নির্ধারণ করা হয়। ফলে শহরের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা খোয়াই নদীর পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীটি শান্ত ও স্থির জলাশয়ে রূপ নেয়। স্থানীয়ভাবে এটি পুরাতন খোয়াই নদী নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

বর্তমানে নদীটি অবৈধ দখল ও দূষণের ফলে সংকুচিত এবং মৃতপ্রায়। তাই এর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ এবং দখলে-ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে শহরের বিভিন্ন স্থানে সামান্য বৃষ্টিপাতেও জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

    শেয়ার করুন: