ড্যাবের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে স্বাস্থ্য বিভাগে অস্থিরতা
- সদ্য নিয়োগ হওয়া স্বাস্থ্য পরিচালককে ফ্যাসিস্ট দাবি
- নিজেকে বিএনপির লোক দাবি পরিচালকের

বরিশালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কার্যালয়ে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। অরাজকতার কেন্দ্রে এখন বিভাগীয় পরিচালকের পদ। এই চেয়ারে সদ্য নিয়োগ পেয়েছেন ডা. এস এম মনিরুজ্জামান। তাতে বেজার ক্ষমতাসীন দলের চিকিৎসকদের একাংশ। আবার তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে অন্য পক্ষ। এতেই বেধেছে বিপত্তি। তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে সকাল-বিকাল বের করে দিচ্ছে এক গ্রুপ, আবার দলীয় লোক দাবি করে তার নিয়োগ বাতিল হলে পুরো খাত অচল করে দেওয়ার হুমকি আরেক গ্রুপের।
ডা. মনিরুজ্জামানকে নিয়ে অন্তর্কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছেন বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) দুই পক্ষের চিকিৎসকরা। এক পক্ষ তাকে ফ্যাসিস্ট ও জুলাইবিরোধী আখ্যা দিয়ে নিয়োগ ও পদায়ন বাতিলের দাবিতে পালন করছে লাগাতার কর্মসূচি। অন্যদিকে নিয়োগ বা পদায়ন বাতিল হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে অন্য পক্ষ।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের সাবেক উপপরিচালক ডা. মনিরুজ্জামানকে গত ৫ জুলাই বরিশালের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক পদে নিয়োগ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরদিন ওই পদে যোগ দেন তিনি। ৭ জুলাই তার কার্যালয়ের সামনে নিয়োগ বাতিল চেয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন ড্যাবের একাংশের নেতাকর্মীরা। পরদিন তার দপ্তরে হানা দেন শেবাচিম শাখা ড্যাবের সভাপতি ডা. নজরুল ইসলাম সেলিম। তিনি কয়েক অনুসারী নিয়ে বের করে দেন ডা. মনিরুজ্জামানকে। এ কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন ড্যাবের সাবেক নেতা ডা. আজিজ রহিম, ডা. মিজানুর রহমান প্রমুখ।
ডা. মনিরুজ্জামানকে বের করে পরিচালকের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। পরদিন সেই তালা খোলায় আবার হানা দেন ড্যাব নেতা সেলিম ও তার সহযোগীরা। আবার ঝুলিয়ে দেন তালা। এতে আটকা পড়েন অন্তত ১৫ কর্মচারী। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেন তাদের— জানালেন দপ্তরের অন্য কর্মীরা।
বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয়ে তালা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ডা. সেলিম বললেন, শেবাচিমের উপপরিচালক পদে থাকাকালে জুলাই আন্দোলনবিরোধী শান্তি মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন ডা. মনিরুজ্জামান। যোগ দিয়েছেন ফ্যাসিবাদী আমলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) অনেক কর্মসূচিতে। আওয়ামী আমলে তার নিয়মিত পদোন্নতি হলেও আমরা ছিলাম বঞ্চিত। এখন নিজেকে বিএনপি দাবি করছেন তিনি। তাই এই নিয়োগ আমরা মানি না। অবিলম্বে তাকে সরিয়ে বসাতে হবে জুলাই আন্দোলনের পক্ষের কাউকে।
একই সুরে কথা বললেন বরিশাল জেলা ড্যাবের সভাপতি ডা. কবিরুজ্জামান। তার ভাষ্য, স্বাস্থ্যের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ড্যাবের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে নেওয়া উচিত; কিন্তু তা মানছেন না মন্ত্রী। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ার আগে আমাদের সঙ্গে আলাপ করে নিলে তৈরি হতো না এমন পরিস্থিতি।
তবে উল্টো সুর ড্যাবের শেবাচিম শাখার সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রের সাবেক সহসভাপতি ডা. আজিজ রহিমের। তার দাবি, কেন্দ্রীয় ড্যাবের আজীবন সদস্য ডা. মনিরুজ্জামান। গত ১২ ফেব্রুয়ারির আগে কেন্দ্র থেকে ড্যাবের যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি হয়েছিল, তাতেও ছিলেন তিনি। একসঙ্গে চালিয়েছি প্রচারণাও। হঠাৎ কেন এই বিভক্তি, বুঝতে পারছি না। এই আপত্তি স্রেফ ব্যক্তিগত কারণে। পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে ডা. মনিরুজ্জামান যে পক্ষের সহায়তা পেয়েছেন, তাদের সঙ্গে সেলিমদের সম্পর্ক ভালো না।
আরও প্রতিবাদী কণ্ঠে সেলিমের সমালোচনা করলেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের বরিশাল বিভাগীয় সদস্যসচিব ও জেলা ড্যাবের সাবেক সহসভাপতি ডা. মিজানুর রহমান। তার দাবি, শেবাচিম শাখা ছাত্রদলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ও পরে সহসভাপতি ছিলেন ডা. মনিরুজ্জামান।
আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার শঙ্কায় শেবাচিম হাসপাতালের দুই চিকিৎসক বললেন, ডা. মনিরুজ্জামানের নিয়োগ বাতিল হলে যে আন্দোলন হবে, তার ভার বইতে পারবে না ড্যাবের সেলিম গ্রুপ। তার অনুসারীকে নিয়োগ না দেওয়ায় এই অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন এই ড্যাব নেতা।
নিজেকে বিএনপির খাস লোক দাবি করলেন বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান। তার ব্যাখ্যা, শেবাচিম হাসপাতালে উপপরিচালক থাকা অবস্থায় সরকারি নির্দেশনা পালনে যোগ দিয়েছিলেন জুলাই আন্দোলনবিরোধী শান্তি সমাবেশে। এর বাইরে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচিতে যাননি তিনি। এমনকি ছাত্রজীবন থেকেই সম্পৃক্ত ছিলেন বিএনপির রাজনীতিতে। এখন যারা বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা করছে, তাদের উদ্দেশ্য অস্পষ্ট।




