টাঙ্গাইলে একমুঠো মাটিতে গড়ে ওঠে নান্দনিক শিল্পকর্ম

ছবিঃ আগামীর সময়
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার এলাশিন ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম পালপাড়া। নামটি উচ্চারণ করলেই যেন নাকে ভেসে আসে ভেজা মাটির গন্ধ, কানে বাজে ঘূর্ণায়মান চাকার সুর। শিল্পীর নিপুণ হাতে গড়া প্রতিটি মাটির সৃষ্টি এখানে শুধু একটি পণ্য নয়, বরং সময়ের বুকে লেখা ইতিহাসের মতো। এই গ্রামের একমুঠো মাটি যেন বহন করে শেকড়ের টান, পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার আর প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের নীরব কাহিনী।
সকালের প্রথম আলো ফুটতেই এই গ্রামের উঠানগুলো যেন রূপ নেয় একেকটি খোলা প্রদর্শনীতে। সারি সারি সাজানো মাটির হাঁড়ি, কলস, থালা, পুতুল আর নানান তৈজসপত্র রোদে শুকাতে থাকে। প্রতিটি পাত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কারিগরের নিখুঁত হাতের ছোঁয়া, বছরের পর বছর চর্চায় অর্জিত দক্ষতা আর মমতার ছাপ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক স্বর্ণালী গ্রাম।
একসময় এই পালপাড়া ছিল মৃৎশিল্পের জন্য সুপরিচিত। গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যবহার হতো এখানকার তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস কিংবা শোপিস। বিয়েবাড়ি, পূজা-পার্বণ কিংবা নিত্যদিনের রান্নাঘর সবখানেই ছিল মাটির পণ্যের দাপট। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই জৌলুস আজ অনেকটাই ম্লান। তবুও থেমে নেই এই গ্রামের মানুষ।
অভাব-অনটন আর প্রতিকূলতার মাঝেও বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কুমার সম্প্রদায়ের কারিগররা।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় তাদের জীবনযুদ্ধ। কাঁচা মাটি সংগ্রহ থেকে শুরু করে মণ্ড তৈরি, চাকার ওপর আকার দেওয়া, শুকানো, পোড়ানো প্রতিটি ধাপেই লেগে থাকে ধৈর্য, দক্ষতা আর সময়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কালের বিবর্তনে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে এই প্রাচীন শিল্প। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ সব মিলিয়ে সংকটে পড়েছে মৃৎশিল্প। অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন, কেউ চলে গেছেন অন্য কাজের সন্ধানে। তবুও কিছু মানুষ এখনও আঁকড়ে ধরে আছেন এই ঐতিহ্য।
গ্রামের প্রবীণ কারিগর রঘুনাথ পাল বলেছেন, ‘একসময় মাটির জিনিস ছাড়া গ্রামীণ জীবন কল্পনাই করা যেত না। এখন সেই শিল্প টিকে থাকার লড়াই করছে।’
আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্লাস্টিক ও মেলামাইনের পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার এই শিল্পকে আরও কোণঠাসা করে তুলেছে। প্রয়োজনীয় বাজারসুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। তবুও আশার আলো নিভে যায়নি। কারিগর জগৎনাথ পাল এখনও স্বপ্ন দেখেন একদিন আবার ফিরবে মাটির পণ্যের কদর।
মৃৎশিল্পী রানি পাল বলেছেন, ‘দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। স্বপ্ন দেখি একদিন আবার আমাদের এই শিল্পের মূল্যায়ন হবে, তখন হয়তো আমাদের ঘরেও ফিরবে সুখ।’
পালপাড়া গ্রামে প্রায় সাত শতাধিক পরিবার সরাসরি মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। পরিবারের নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুরাও কোনো না কোনোভাবে এই কাজে অংশ নেয়। ফলে এটি শুধু একটি পেশা নয়, বরং একটি জীবনধারা।
স্থানীয়দের মতে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, আধুনিক ডিজাইন ও বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
দেলদুয়ার উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এস এম ফেরদৌস আহমেদও মনে করেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে মৃৎশিল্পে নতুন প্রাণ ফিরে আসবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা যূথী জানান, মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিক প্রশিক্ষণ, নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরি, বাজার সম্প্রসারণ এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের মতো উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাটির গন্ধে মিশে থাকা এই শিল্প শুধু অর্থনীতির বিষয় নয় এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং শেকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। পালপাড়ার এই কারিগররা তাই শুধু পণ্য তৈরি করছেন না, তারা বাঁচিয়ে রাখছেন এক টুকরো ইতিহাস, এক টুকরো বাংলাদেশ।















