লাকসাম
বিলুপ্তির পথে দেশীয় প্রজাতির মাছ!

ছবি: আগামীর সময়
কুমিল্লার লাকসাম থেকে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে হরেকরকম দেশীয় প্রজাতির মাছ। নদী-নালা, খাল-বিল ও ডোবা-গর্ত ভরাট হয়ে যাওয়া, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া, অনুকূল পরিবেশ না থাকা, নির্বিচারে ছোট মাছ নিধন এবং ডিমওয়ালা মাছ ধরার কারণে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ আজ বিপন্ন। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অচিরেই এই জনপদ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে দেশি প্রজাতির মাছের ঐতিহ্য।
মাছে–ভাতে বাঙালি—বেশ পুরোনো প্রবাদ। দেশে ধানের উৎপাদন বাড়ায় কয়েক বছর ধরে ভাতের অভাব নেই। কিন্তু দেশি মাছ কম পাওয়া যাচ্ছিল। নদীতে দূষণ ও পলি পড়ায় মাছের উৎপাদন কমে আসে। দামও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়।
বাংলাদেশ হচ্ছে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওরের দেশ। এদেশের প্রায় ৮৫ ভাগ মানুষ কৃষক। কৃষি নির্ভর এদেশে ধান, শাক-সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি মাছ চাষেও আমাদের কৃষকরা এগিয়ে রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে মাছ। কিন্তু আমাদের দেশীয় প্রজাতির মাছ এখন আনেকটাই বিলুপ্তির পথে। বিপন্ন হয়ে গেছে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কল-কারখানার বর্জে আমাদের খাল-বিল, নদী এখন দখল আর দূষণে ভরা। হারিয়ে ফেলছে খাল, নদীর নাব্যতা। খালগুলো নানা রকম ঘাস, কচুরিপানায় ভরাট হয়েছে। বন্ধ হয়ে পড়েছে পানির প্রবাহ। নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকলেও এসব খালে-বিলে মাছের অবাধ বিচরণ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্ষা মৌসুমে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে একশ্রেণির মাছ শিকারীরা মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশি প্রজাতির পোনামাছগুলো নিধন করছে। এ ছাড়া চৈত্র-বৈশাখ মাসে বৃষ্টি হলে খাল-বিল, ডোবা-পুকুরে নতুন পানি জমে। এ সময় দেশি প্রজাতির বিভিন্ন রকম মাছ ডিম ছাড়ে। গ্রাম-গঞ্জের মাছ শিকারীরা অবাধে ডিমওয়ালা মাছগুলো শিকার করে মাছের প্রজনন ধংস করে দিচ্ছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আমাদের কৃষি উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দেশি প্রজাতির মাছ ধংস হয়ে গেছে। কিছু দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্তপ্রায়। আবার কিছু প্রজাতির মাছ বিপন্ন হওয়ার উপক্রম। প্রজননের সঠিক অনুকূল পরিবেশ না থাকায় এসব দেশি প্রজাতির মাছ এখন বিপন্নের পথে।
এতদাঞ্চলের খাল-বিলে এক সময় দেশি প্রজাতির নাপতিনী, আইন্না, ছোট টেংরা, ছোট চাঁন্দা, বজরী, চেঁপলী, কাঁইক্কা, বুতুম, ভেদা, খৈলশা, ঘাগুড়, চাঁপিলা, দারকিনি, চোখা মাছে ভরপুর ছিল। এখন আর ওইসব মাছ দেখতে পাওয়া যায় না। এগুলো বিলুপ্তপ্রায়।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এক যুগ আগেও উপজেলার ডাকাতিয়া নদী, বিভিন্ন খাল-বিল ও মজাপুকুরগুলোতে প্রচুর পরিমাণে দেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। অথচ এখন খুব সামান্যই পাওয়া যায় সেসব মাছ।
লাকসাম উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এক যুগ আগেও এ অঞ্চলে প্রায় ৭০ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে ৫৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে।
উপজেলার বাকই (দক্ষিণ), গোবিন্দপুর, উত্তরদা, মুদাফরগঞ্জ (উত্তর), মুদাফরগঞ্জ (দক্ষিণ), কান্দিরপাড়, আজগরা, লাকসাম (পূর্ব) ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কমপক্ষে ১০ জন মৎস্যজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে উপজেলার ডাকাতিয়া নদী, ঘাঘুর খাল, গাজীমুড়া খাল, চালতাতলী খাল, ছিলোনিয়া খাল, বেরুল্লা খাল, মেল্লার খাল, সালেপুর, কাগৈয়া, ফুলহরা খালসহ বিভিন্ন খাল-বিল ও পুকুরে এখন আর আগের মতো দেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় না।
বর্তমানে এই অঞ্চলে ‘বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে, বাচা, গোলসা, তিতপুঁটি, পাবদা, দাঁড়কিনা, খলিশা, কাঁইক্কা, চেঁপলী, নামা চান্দা, চাপিলা, বড়বাইম, বোয়াল, আইড়, ঘারুয়া, ভেঁদা, নাপতিনী ও সরপুঁটি মাছ।
একটি পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের মিঠা পানিতে ২৬০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক ও মানুষের সৃষ্ট নানা কারণে মিঠা পানির ১২ প্রজাতির মাছ চরম বিপন্ন। ৫৪ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত। ২৮ প্রজাতির মাছ বিপন্ন এবং ১৪ প্রজাতির মাছ সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট উৎপাদনের মাত্র ১৬ শতাংশ হচ্ছে সামুদ্রিক মাছ এবং ৮৪ শতাংশ মিঠা পানির মাছ। এই ৮৪ শতাংশ মিঠাপানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে মধ্যে ১৪৩ প্রজাতি হচ্ছে ছোট মাছ। তন্মধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়।
লাকসাম অঞ্চল থেকে এরই মধ্যে বোয়াল, লালচাঁদা, কাঁইক্কা, বুতুম, আইন্না, বজরী, নাপতিনী, চেঁপলী, তারাবাইম, ভেদা, ঘাঁরুয়া, বাউশ, আইড়, পাবদা, সরপুঁটি, তিতপুঁটিসহ ১৫ প্রজাতির মাছ বিলীন হয়ে গেছে। অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে টেংরা, খলুই, ভেদা, শিং, কৈ, মাগুর, বেলে, টাকি, খলিশা, পুঁটি ও বাইমসহ নানা জাতের মাছ। যদিও বর্তমানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাইব্রিড কৈ ও আফ্রিকান মাগুর চাষ হচ্ছে, তবে স্বাদ ও গুণাগুণের দিক থেকে তা দেশি মাছের ধারেকাছেও নয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জাদুঘর ও জীববৈচিত্র্য কেন্দ্রের জরিপে দেখা গেছে, দেশজুড়ে হুমকির মুখে পড়া মাছের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে এবং ২৫ প্রজাতির মাছ ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। বছর দশেক আগেও গ্রামীণ হাট-বাজারে যেসব ছোট মাছ সস্তায় মিলত, এখন তা কেবল উচ্চবিত্তের পাতে শোভা পায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, ছোট মাছের উপকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা, জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান এবং কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণ সম্ভব। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক উৎসের সুস্বাদু এসব মাছ কেবল রূপকথার গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে।




