লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথ
বিনা টিকিটের স্টেশন!

ছবি: আগামীর সময়
স্টেশন আছে। ট্রেন থামে। যাত্রীও ওঠে। তবে টিকিট কাটে না কেউ। কাটবেই বা কী করে? এ স্টেশনে রেলওয়ের কোনো কর্মীই নেই! বিনা টিকিটের এ রেলওয়ে স্টেশনের নাম দৌলতগঞ্জ। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথে এমন ছয়টি বিনা টিকিটের স্টেশন আছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম থেকে রেলপথে নোয়াখালীর দূরত্ব প্রায় ৫২ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই রেলপথে মোট ১২টি স্টেশন। এর মধ্যে ৬টি স্টেশনের কার্যক্রম প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব স্টেশনে এখনো ট্রেন থামে, যাত্রীও ওঠে। তবে টিকিট বিক্রি হয় না।
রেলপথে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টেশনগুলো হচ্ছে- দৌলতগঞ্জ, খিলা, বিপুলাসার, বজরা, মাইজদী ও হরিনারায়ণপুর। প্রতিদিন স্টেশনগুলোতে ট্রেন থামে। গড়ে ১৪০ থেকে ১৬০ জন যাত্রী ওঠা-নামা করেন। কিন্তু কেউ টিকিট কাটেন না। এসব স্টেশনে বিনা টিকিটে যাত্রী ওঠার পাশাপাশি বুকিং ছাড়াই মালামাল পারাপার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও প্রতিনিয়ত রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
এদিকে স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় রাতে সেখানে মাদকসেবীদের জমজমাট আড্ডা বসে। চলে অসামাজিক কার্যক্রমও।
রেলওয়ে সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০০৩ সালের পর থেকে পর্যায়ক্রমে এসব স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৭ সালে লাকসাম পৌর শহরের দৌলতগঞ্জ স্টেশনটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। আগে এই রেলপথে প্রতিদিন দুটি আন্তঃনগর, দুটি এক্সপ্রেস, দুটি লোকাল এবং চারটি ডেমুসহ অন্তত ১০টি ট্রেন চলাচল করত। বর্তমানে রেলপথে ঢাকা-নোয়াখালী আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস নামে একটি ট্রেন চলাচল করে। আরেকটি এক্সপ্রেস ট্রেন তিনটি ভিন্ন নামে চলাচল করে। এক্সপ্রেস ট্রেনটি কখনো ঢাকা এক্সপ্রেস, কখনো নোয়াখালী এক্সপ্রেস আবার কখনো সমতট এক্সপ্রেস নামে চলাচল করছে। যদিও স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে এটি লোকাল ট্রেন নামে পরিচিত।
যাত্রী ও রেলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লোকাল ট্রেনটি এক দিন নোয়াখালী–লাকসাম পথে চলাচল করে। আরেকদিন নোয়াখালী–ঢাকা পথে চলাচল করে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, লোকোমোটিভ ও জনবলসংকটসহ নানা কারণে বিভিন্ন সময়ে এসব স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। তবে মানুষের যাতায়াতের কথা চিন্তা করে এখনো ট্রেনসেবা চালু রাখা হয়েছে। এসব স্টেশন থেকে যাত্রী উঠলে ট্রেনে থাকা ট্রেন টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) যাত্রীদের কাছ থেকে নিয়মানুসারে ভাড়া আদায় করেন।
লাকসাম রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৯১ সালে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত রেলপথ স্থাপিত হয়। ১৮৯৫ সালে উদ্বোধন করা হয় লাকসাম রেলওয়ে জংশন (তৎকালীন বড়তুপা)। পর্যায়ক্রমে লাকসাম থেকে নোয়াখালী ও চাঁদপুর দুটি লাইন সম্প্রসারিত হয়। লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথ প্রতিষ্ঠার সময় দৌলতগঞ্জ স্টেশনটি স্থাপন করা হয়। এ স্টেশনটি ডাকাতিয়া নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় নদীপথে আসা মালামাল ট্রেনে আনা-নেওয়ার জন্য এটিকে ব্যবহার করা হতো।
সূত্র আরও জানায়, দৌলতগঞ্জ স্টেশনে একসময় তিনজন স্টেশনমাস্টার (এসএম), তিনজন সহকারী স্টেশনমাস্টার (এএসএম), গুডস্ ক্লার্ক, বুকিং ক্লার্ক, টালি ক্লার্ক পদে একজন করে, নিরাপত্তা বাহিনী পদে তিনজন, পোর্টার পদে দুইজন এবং পয়েন্টসম্যান পদে পাঁচজনসহ বিভিন্ন পদে লোকবল নিয়োগ ছিল। বাকি স্টেশনগুলোতেও এভাবে কমবেশি লোকবল ছিল। কিন্তু সব পদই এখন শূন্য। ফলে লোকবলের সংকটে স্টেশনটি বন্ধ হয়ে যায়। অপর পাঁচটি স্টেশনেরও একই অবস্থা। দৌলতগঞ্জ স্টেশনটি দুই দশক আগেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং জমজমাট ছিল।
অত্যন্ত প্রাচীন দৌলতগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে শনিবার (৬ জুন) সরেজমিন দেখা গেছে, টিকিট বিক্রি ও মালামাল পরিবহনে বুকিং কার্যক্রম বন্ধ। স্টেশনমাস্টারের কক্ষে তালা ঝুলছে। আশপাশে কোনো কর্মচারীও নেই। চারদিকে নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। স্টেশনটিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ বসে আড্ডা দিচ্ছেন। প্ল্যাটফরমে ভ্রাম্যমাণ হকাররা নানা রকম পসরা সাজিয়ে দোকান বসিয়েছেন।
এ সময় দেখা মিলল দৌলতগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের অনেক পুরনো একজন কর্মচারী (পোর্টার) মো. সেলিম মিয়ার। স্টেশনের প্ল্যাটফরমের একটি বেঞ্চে বসে আছেন। কথা হয় তার সঙ্গে।
তার মতে, দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এ স্টেশনে চাকরি করতেন। ২০১৭ সালে অবসরের যান। বাড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগে না। তাই প্রতিদিন স্টেশনে এসে বসে থাকেন। পুরনো লোকজনের দেখা পেলে গল্প করে সময় কাটান।
তিনি আরও জানান, ২০০৮ সালের ৫ জুলাই এখানকার স্টেশনমাস্টার বদলি হন। ফলে এ স্টেশনে টিকিট বিক্রিসহ বুকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এ রুটে ডেমু চালু হওয়ায় শুধু ট্রেনেরই টিকিট বিক্রি হতো। সর্বশেষ ২০১৭ সালে লাকসাম পৌর শহরের দৌলতগঞ্জ স্টেশনটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
লাকসামের উত্তরদা ইউনিয়নের চন্দনা গ্রামের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন, রামপুর গ্রামের হাসমত আলী, পোলইয়া গ্রামের মো. আবদুর রব মজুমদার এবং রাজাপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন জানালেন, ‘খিলা ও দৌলতগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন আমাদের গ্রামের দুই দিক থেকে কাছাকাছি। একসময় এই স্টেশনগুলো জমজমাট ছিল। দিন-রাত ট্রেন চলাচলের শব্দ শোনা যেত, ট্রেনের হুইসেল বাজত। যাত্রীদের কলরবে স্টেশন মুখরিত থাকত। কিন্তু এখন আর সেই জৌলুস নেই। স্টেশনগুলো বন্ধ, পাশেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসাবাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে রাতের বেলায় সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডাসহ অসামাজিক কার্যক্রমও চলে।
লাকসাম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মজির আহমেদের ভাষ্য, লাকসামের দৌলতগঞ্জ অত্যন্ত প্রাচীন এবং একটি বিশাল বাণিজ্যিক শহর। এখানে বিভিন্ন কলকারখানাসহ ছোট-বড় প্রায় ৪ হাজারের অধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একসময় এখানকার ব্যবসায়ীরা স্বল্প ব্যয়ে ও নিরাপদে ট্রেনে বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করতেন। কিন্তু এখন স্টেশনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব আয় থেকে।
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) ফারহান মাহমুদ মুঠোফোনে আগামীর সময়কে জানান, পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ না থাকায় ট্রেন চলাচল সীমিতকরণ রয়েছে। এরপরও মানুষের যাতায়াতের কথা বিবেচনায় রেখে রেলওয়ের পরিবহনসেবা চালু রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মো. মোস্তাফিজুর রহমান দুপুরে মুঠোফোনে আগামীর সময়কে জানালেন, জনবল সংকটের কারণে বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টেশনগুলো কীভাবে চালু করা যায় বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ডিআরএম জানান, আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। বর্তমানে জনবল সংকট নিরসনে স্টেশনমাস্টারসহ অন্যান্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শিগগিরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




