দুই বছরের কাজ শেষ হয়নি সাত বছরেও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুধকুমার নদের ওপর নতুন সেতু নির্মাণের ঘোষণা এসেছিল আশার বার্তা নিয়ে। কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্যে আসবে গতি, ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো সেতুর দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে মানুষ— এমন প্রত্যাশাই ছিল স্থানীয়দের। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি সাত বছরেও। নতুন সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় এখনো নির্ভর করতে হচ্ছে পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ বেইলি ব্রিজের ওপর। যদিও গতকাল বুধবার সেতুর স্টিলের পাটাতন ভেঙে বন্ধ হয়ে গেছে যানবাহন চলাচল। সেতুর ওপর একটি বালিবাহী ট্রাক্টর আটকে যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ।
সড়ক বিভাগের তথ্য বলছে, ভূরুঙ্গামারীর দুধকুমার নদের ওপর ৬৪৫ দশমিক ১৫ মিটার সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগ। ২০১৯ সালে ১৩৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড যৌথভাবে পায় কাজটি।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় চার দফা বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পটির মেয়াদ। ব্যয়ও বেড়েছে ৬ কোটির বেশি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, নকশা পরিবর্তন, করোনাকালে কাজের ধীরগতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিলম্ব— সব মিলিয়ে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যায়নি।
সেতুর পিলারের ওপর গার্ডার স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে সবে মাত্র। তবে মূল ঢালাই ও দুই পাশের রেলিং নির্মাণ বাকি। পশ্চিম পাশে সংযোগ সড়কের কাজ চললেও পূর্ব প্রান্তে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে সড়ক নির্মাণ শুরু করা যায়নি। ফলে নতুন সেতু প্রায় দৃশ্যমান হলেও সেটি ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছেন না স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরনো সেতুটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিরাপত্তার কারণে কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে বন্ধ রেখেছে দুই দিকের যান চলাচল। ফলে যানবাহন পার হতে হয় পালাক্রমে। এ কারণে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট, সময়ক্ষেপণ ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে, কচাকাটা থানাসহ পূর্বাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের মানুষের জন্য এটি হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের দুর্ভোগ।
তাদের ভাষ্য, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮৭ সালে লালমনিরহাট থেকে ভারতের গৌহাটি পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের সময় দুধকুমার নদের ওপর নির্মিত হয় ১ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ সোনাহাট রেলসেতু। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ধ্বংস করা হয় সেতুর একটি অংশ। স্বাধীনতার পর এরশাদ সরকারের আমলে সেতুটি মেরামত করে ভূরুঙ্গামারীর দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়ন এবং কচাকাটা ও মাদারগঞ্জ এলাকার সঙ্গে চালু করা হয় সড়ক যোগাযোগ। নির্মাণের সময় সেতুটির আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০০ বছর। সেই হিসাবে প্রায় ৪০ বছর আগেই শেষ হয়েছে এর মেয়াদ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের ১৮তম স্থলবন্দর হিসেবে পরিচিত সোনাহাট স্থলবন্দরকে ঘিরে রয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা ছিল নতুন সেতুর মাধ্যমে। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না সেই সম্ভাবনা।
সোনাহাট স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী আবু হেনা মাসুম ও জহুরুল ইসলামের ভাষ্য, পুরনো সেতুর কারণে ভারী পণ্যবাহী যান চলাচলে তৈরি হচ্ছে বাধা। এতে ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসায়ীরা পড়ছেন আর্থিক ক্ষতির মুখে। একই সঙ্গে সরকারও বঞ্চিত হচ্ছে প্রত্যাশিত রাজস্ব থেকে।
দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করা গেলে বন্দরের কার্যক্রমে গতি ফিরবে এবং সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন তারা।
সেতুর কংক্রিটের কাঠামো প্রায় দাঁড়িয়ে গেলেও মানুষের প্রশ্ন একটাই— আর কত দিন করতে হবে অপেক্ষা। কারণ সেতু শুধু নদীর দুই তীরকে যুক্ত করে না, এটি যুক্ত করে মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও। সোনাহাটের মানুষ এখন সেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাওয়ার অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন।
তবে আশার কথা শোনালেন কুড়িগ্রাম সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বললেন, ‘পুরনো সেতুটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন সেতুর মূল কাঠামোর কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হলে ছয় মাসের মধ্যে সেতুটি খুলে দেওয়া হবে যান চলাচলের জন্য।’




