বাঁশি বাজে না লোকাল ট্রেনের
- আখাউড়া-সিলেট রুটে বাড়ছে ভোগান্তি, কমছে রাজস্ব

বর্তমানে ঢাকা-সিলেট রুটে চলাচল করছে ছয় জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন; কিন্তু এই দীর্ঘ রেলপথে একটি লোকাল ট্রেনও নেই।
আখাউড়া-সিলেট রেলপথ দেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল করিডর। প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথে প্রতিদিন যাতায়াত করেন হাজারো মানুষ; কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ রুটে লোকাল ট্রেন চলাচল না করায় যাত্রীদের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। লোকাল ট্রেন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে ছয়টি রেলস্টেশন। ফলে একদিকে যেমন কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে টিকিট বিক্রির সুযোগ কমে যাওয়ায় সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব। একই সঙ্গে স্থানীয় যাত্রীদের চাপ সামলাতে গিয়ে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোকে ঘন ঘন থামতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে দূরপাল্লার যাত্রীসেবায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও রেলসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা-সিলেট রুটে জয়ন্তিকা, কালনী, উপবন ও পারাবত এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে উদয়ন ও পাহাড়িকা এক্সপ্রেসসহ চলাচল করছে ছয় জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন; কিন্তু এই দীর্ঘ রেলপথে একটি লোকাল ট্রেনও নেই।
তবে এমন পরিস্থিতি সবসময় ছিল না। কয়েক বছর আগেও এই রুটের চিত্র ছিল ভিন্ন। একসময় আখাউড়া-শায়েস্তাগঞ্জ রেলপথে বাল্লা লোকাল, কুশিয়ারা ও সুরমা মেইলসহ একাধিক লোকাল ট্রেন চলত। লোকসানের অজুহাতে ধাপে ধাপে এসব ট্রেন বন্ধ করে দেয় পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে। এরপর থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেরাসানী, সিঙ্গারবিল ও ভাতশালা এবং হবিগঞ্জের কাশিমনগর, ইটাখোলা ও লস্করপুর স্টেশন কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। কোথাও স্টেশন ভবন এখন গোয়ালঘর, কোথাও ব্যবহৃত হচ্ছে মুরগির খামার হিসেবে।
লোকাল ট্রেন বন্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। বিশেষ করে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর এর চাপ স্পষ্ট। আখাউড়ার উত্তর ইউনিয়নের আজমপুর এলাকার বাসিন্দা আবুল কাশেম ভূঁইয়ার ভাষায়, আগে কৃষক লোকাল ট্রেনে সহজেই কৃষিপণ্য বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যেতে পারতেন। এখন আন্তঃনগর ট্রেনই একমাত্র ভরসা; কিন্তু অধিকাংশ স্টেশন বন্ধ থাকায় টিকিট কাটার সুযোগও নেই। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে বিনা টিকিটে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাদের।
শুধু কৃষক বা ব্যবসায়ী নন, লোকাল ট্রেন না থাকায় চাপ বেড়েছে আন্তঃনগর ট্রেনেও। ঢাকা থেকে সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেসের যাত্রী ফারজানা ইসলাম বললেন ভোগান্তির কথা, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত ট্রেন স্বাভাবিক গতিতে এলেও এরপর থামতে হয় আজমপুরসহ একের পর এক স্টেশনে। এতে দীর্ঘপথের যাত্রীদের ভ্রমণের সময় বেড়ে যায় এবং অস্বস্তিও বাড়ে।’
এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারের রাজস্ব ক্ষতি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে যাত্রীকল্যাণ সংগঠনের সভাপতি মো. ইব্রাহিম খান সাদাত মনে করেন, স্টেশন বন্ধ থাকায় অনেক যাত্রীর টিকিট কাটার সুযোগ থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে বিনা টিকিটে ভ্রমণ করেন তারা। এতে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে। একই সঙ্গে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্যও পাচ্ছেন না।
তার মতে, লোকাল ট্রেন আবার চালু এবং বন্ধ স্টেশনগুলো সচল করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি যেমন গতিশীল হবে, তেমনি আন্তঃনগর ট্রেনের ওপর চাপও অনেকটাই কমবে।
তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, অবকাঠামো উন্নয়নের বড় পরিকল্পনা এর মধ্যে নেওয়া হয়েছে। আখাউড়া রেল সেকশনের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু হানিফ পাশার ভাষ্য, ‘সরকার প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আখাউড়া-সিলেট রেলপথকে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর এবং আধুনিকায়নের একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যাত্রীসেবার মান বাড়বে এবং পণ্য পরিবহনও হবে গতিশীল।’ তবে লোকাল ট্রেন ও বন্ধ স্টেশন আবার চালুর বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন তিনি।




