সুন্দরবনে ‘বিষদস্যু’ দলে এবার দুই নারী, বনরক্ষীদের ওপর হামলার অভিযোগ

বাধা দিতে গেলে নৌকার বৈঠা, লাঠি ও দা নিয়ে বন বিভাগের কর্মীদের ওপর চড়াও হন বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা দুই নারী ও দুই পুরুষ
সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের প্রবণতা নতুন নয়। প্রায় দেড় দশক ধরে কীটনাশক ও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে মাছ ধরছে এক শ্রেণির অসাধু জেলে। সময়ের সঙ্গে বনের বিভিন্ন নদী ও খালে ছড়িয়ে পড়েছে এই অপরাধ। তবে সম্প্রতি তা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাছ শিকারের পাশাপাশি বনরক্ষীদের কাজে বাধা দেওয়া এবং তাদের ওপর হামলার চেষ্টার অভিযোগও উঠছে এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে।
বন বিভাগের ভাষায়, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী এসব অপরাধী ‘বিষদস্যু’ নামে পরিচিত। এতদিন এই অপরাধে পুরুষদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও এবার প্রথমবারের মতো বিষদস্যুদের তালিকায় দুই নারীর নাম এসেছে। বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সময় বনরক্ষীদের ওপর হামলার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
গতকাল সোমবার দুপুরে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের জোংড়া টহল ফাঁড়ির আওতাধীন ছোট জোংড়া খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সময় দুই নারী ও দুই পুরুষকে শনাক্ত করেন বনরক্ষীরা। তাদের বাধা দিতে গেলে নৌকার বৈঠা, লাঠি ও দা নিয়ে বন বিভাগের কর্মীদের ওপর চড়াও হন বলে অভিযোগ। একপর্যায়ে বনরক্ষীদের প্রতিরোধের মুখে নৌকা ও সরঞ্জাম ফেলে বনের ভেতরে পালিয়ে যান তারা।
ঘটনাস্থল থেকে একটি নৌকা, খালপাটা জাল, বিষের খালি বোতল এবং বিষ প্রয়োগ করা কিছু মাছ জব্দ করেন বনকর্মীরা। এ ঘটনায় দুই নারী ও দুই পুরুষকে আসামি করে দাকোপ থানায় অভিযোগ দিয়েছে বন বিভাগ।
অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন— মোংলার জয়মনি এলাকার আব্বাস শেখের ছেলে মো. সোহেল শেখ, আজীম উদ্দীনের ছেলে ইউনুচ আলী এবং নুর আলী শেখের মেয়ে লাইজু বেগম ও কালাই খার মেয়ে নুপুর খা।
বনরক্ষীদের ওপর হামলার চেষ্টা
বন বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সোমবার দুপুরে ছোট জোংড়া খালে একটি নৌকা প্রবেশ করতে দেখে জোংড়া টহল ফাঁড়ির কর্মীদের সন্দেহ হয়। নৌকাটিতে দুই পুরুষ ও দুই নারী ছিলেন। পরে ফাঁড়ির ছয় বনকর্মী দুই দলে ভাগ হয়ে অভিযান চালান। তিনজন হেঁটে এবং অন্য তিনজন ট্রলারে করে খালের দিকে এগিয়ে যান।
সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, এক নারী খালের মধ্যে খালপাটা জাল পেতে বসে আছেন। এ সময় পানিতে মাছের অস্বাভাবিক লাফালাফি করতে দেখা যায়। বনকর্মীরা ওই নারীর কাছে জাল পাতার কারণ এবং মাছের এমন আচরণের বিষয়ে জানতে চান।
এর কিছুক্ষণ পর ইউনুচ আলী নামের এক ব্যক্তি বন থেকে নেমে নৌকায় ওঠেন। বনকর্মীরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং নৌকাটি টহল ট্রলারের সঙ্গে আটকানোর নির্দেশ দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এক ব্যক্তি দা দিয়ে বন বিভাগের এক কর্মীকে কোপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় বন বিভাগের ট্রলারেও কয়েকটি কোপ দেওয়া হয়।
পরে নারী ও পুরুষ উভয়েই বৈঠা নিয়ে বনকর্মীদের মারতে উদ্যত হন। নারীরাও বনকর্মীদের হেনস্তা ও কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করেছে বন বিভাগ।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য কিছুটা দূরে সরে যান বনকর্মীরা। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দীপন চন্দ্র দাস চাঁদপাই স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত জনবল নিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। স্টেশন কর্মকর্তা ও তার সঙ্গে থাকা টহল দল সেখানে পৌঁছালে তাদের ওপরও হামলার চেষ্টা করা হয় বলে বন বিভাগের অভিযোগ।
পরে বনকর্মীরা অভিযুক্তদের নৌকা, জাল, বিষের খালি বোতল ও বিষ প্রয়োগ করা মাছ জব্দ করে ফাঁড়িতে ফিরে আসেন।
বিষে বিপন্ন বনের জলজ প্রাণী
সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের প্রভাব শুধু মৎস্য সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের সামগ্রিক জলজ বাস্তুতন্ত্র। খাল ও নদীতে বিষ ছড়িয়ে পড়ায় মাছের পাশাপাশি মারা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ, পোনা, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এর নেতিবাচক প্রভাব বনের অন্যান্য প্রাণীর ওপরও পড়তে পারে।
সাধারণত বিষ প্রয়োগের পর পানিতে থাকা মাছ দুর্বল হয়ে ভেসে ওঠে। তখন জেলেরা সহজেই জাল দিয়ে সেগুলো সংগ্রহ করেন। এতে অল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়া গেলেও ধ্বংস হয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারের স্বাভাবিক পরিবেশ। বিষের প্রভাবে আক্রান্ত বা মারা যাওয়া অনেক জলজ প্রাণী পানির তলদেশে কিংবা খালের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে। ফলে ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সুন্দরবনের খালগুলো মাছের আবাসস্থল হওয়ার পাশাপাশি বনের অসংখ্য প্রাণীর খাদ্য ও জীবনধারণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব জলাশয়ে বিষ প্রয়োগের কারণে ছোট মাছ ও পোনা ধ্বংস হলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন বিভাগের সাফল্যে বাধা বিষদস্যুরা
বন বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে হরিণ শিকারসহ বিভিন্ন ধরনের বন্য প্রাণী শিকার ও বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অবৈধ শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান, ফাঁদ উদ্ধার এবং টহল জোরদারের মাধ্যমে এসব অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি বন বিভাগের।
তবে বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বনের প্রত্যন্ত খাল ও নদীতে বিষ প্রয়োগ, বনকর্মীদের কাজে বাধা এবং তাদের ওপর হামলার চেষ্টার কারণে টহল কার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ফলে বন বিভাগের নানা উদ্যোগের পরও বিষদস্যুদের তৎপরতা সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবার বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ঘটনায় দুই নারীর নাম আসায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ডে নারীদের এমন সম্পৃক্ততা আগে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
জোংড়া টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান বললেন, সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে এবারই প্রথম নারী বিষদস্যুর সন্ধান পেয়েছেন তারা। দুই নারী ও দুই পুরুষ মিলে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সময় বনকর্মীরা বাধা দিলে তারা হামলার চেষ্টা করেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে নৌকা, জাল, বিষের বোতলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বিষদস্যুদের দৌরাত্ম্য এবং বনকর্মীদের ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ সুন্দরবন রক্ষার কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু অভিযান ও মামলা করে এই অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ডিএফও বললেন, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিষ ও রাসায়নিক দ্রব্যের উৎস শনাক্ত এবং সরবরাহ বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধীদের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের সম্পৃক্ত করে নজরদারি বাড়াতে হবে। বনকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল বাড়ানোও জরুরি।



