পার্বতীপুরে ঈদের ভিন্নধর্মী আনন্দ
মাঠে বিবাহিত বনাম অবিবাহিতদের লড়াই, কলার পাতায় ভোজ

ছবি: আগামীর সময়
চলছে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি। ইটের পাঁজরঘেরা যান্ত্রিক শহরের কোলাহল ছেড়ে নারীর টানে, নাড়ির টানে এখন অনেকেই গ্রামে। গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনেকে যেন ফিরে যাচ্ছেন নিজের চেনা শৈশবে। শহুরে জীবনের চাকার নিচে পিষ্ট হওয়া মানুষগুলো গ্রামে ফিরেই সবার আগে ছুটে যাচ্ছেন শৈশবের সেই চেনা খেলার মাঠে; যেখানে একসময় বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আজ শুধুই সুখস্মৃতি। আর সেই স্মৃতিরোমন্থনের আনন্দকে যদি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেওয়া যায় কোনো ভিন্নধর্মী আয়োজনে, তবে তো কথাই নেই!
প্রতি বছর ঈদ এলেই দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় এক অন্যরকম উৎসব—মাঠে নামে বিবাহিত আর অবিবাহিতদের দল। ফুটবল কিংবা ক্রিকেট ব্যাটের ঠোকাঠুকিতে জমে ওঠে এক পিনপতন লড়াই। গ্রামের একদিকে থাকেন সংসারী ‘বিবাহিত’ পুরুষেরা, আর অন্য প্রান্তে তাঁদের টেক্কা দিতে প্রস্তুত চিরতরুণ ‘অবিবাহিত’ যুবকেরা।
ব্যতিক্রম হয়নি এবারও। পার্বতীপুরের দোয়ানিয়া গ্রামে এবারের ঈদেও শুরু হয়েছে বিবাহিত-অবিবাহিতদের এমনই এক জমজমাট ক্রিকেট যুদ্ধ। শুধু দোয়ানিয়া গ্রামই নয়, পুরো দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে এখন মুখরিত এমন ভিন্নধর্মী খেলার হাত ধরে। এই এক খেলাই যেন পুরো অঞ্চলের ঈদের আনন্দকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এসব ম্যাচে মাঠের লড়াই যতটা না জেদ বা অহংকারের, তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দের ও সৌহার্দ্যের। খেলায় জয়ী দলের জন্য পুরস্কার হিসেবে রাখা হয় জ্যান্ত হাঁস কিংবা খাসি। তবে এই আয়োজন কেবল মাঠের খেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আসল উৎসব জমে ওঠে সূর্য ডোবার পর। রাতে বিজয়ী আর বিজিত—দুই দল মিলেমিশে আয়োজন করে এক মহা পিকনিকের। গ্রামের খোলা মাঠে ঝিঁঝি পোকার ডাক আর রাতের নির্মল বাতাস গায়ে মেখে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আড্ডা, গল্প আর রান্নাবান্না। আর সেই রান্নার শেষে মধ্যরাতে কলার পাতায় গরম গরম খাবার পরিবেশন যেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক পরম ছোঁয়া। আয়োজকদের মতে, এমন চেনা আয়োজনই গ্রামের ঈদকে অনন্য ও প্রাণবন্ত করে তোলে।
রাজধানীর একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত মো. আনোয়ার হোসেন (৪০)। কর্মব্যস্ততার কারণে টানা দুই ঈদ পর এবার গ্রামের বাড়িতে আসার সুযোগ পেয়েছেন। মাঠে খেলতে নেমে উচ্ছ্বসিত আনোয়ার বললেন, 'ঈদে বাড়িতে আসার আনন্দটাই অন্যরকম। গ্রামের এই নির্মল বাতাস, মাটির সোঁদা গন্ধ আর শৈশবের মাঠ দেখলেই মনটা জুড়িয়ে যায়। ঈদে বাড়ি আসলেই আমি বিবাহিত-অবিবাহিতদের এই খেলায় অংশ নিই। আগের মতো হয়তো দৌড়াতে পারি না, কিন্তু এই আয়োজন আমাদের সরাসরি শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এর যে কী মূল্য আর কী আনন্দ, তা মুখে বলে বোঝানো সম্ভব না।'
আনোয়ার হোসেনের মতো এমন চিলতে সুখ আর নস্টালজিয়া এখন ছুঁয়ে গেছে ঈদের ছুটিতে গ্রামে ফেরা প্রতিটি মানুষের মনকে। এই বিবাহিত-অবিবাহিতদের প্রীতি ম্যাচ যেন কেবল একটি খেলা নয়, এটি শহুরে ক্লান্তি ভুলে গ্রামীণ মেলবন্ধনের এক দারুণ উৎসব।






