সত্য ও প্রকৃতির অনুসন্ধানে কাটল যে জীবন
- তিন দশকের সাংবাদিকতায় তুলে ধরেছেন সমুদ্র, পাহাড় ও জীববৈচিত্র্যের অজানা গল্প
- জীবনের শেষ ১৫ বছর কেটেছে দরিয়ানগরের পাহাড়ের ঢালে জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, লেখক ও সামুদ্রিক পরিবেশ গবেষক আহমদ গিয়াস
সমুদ্রের ঢেউ, বালুচরের পরিবর্তন কিংবা পাহাড়ের গাছপালা। অন্যের চোখে যেসব দৃশ্য ছিল নিতান্তই সাধারণ, সেখানেও সংবাদ খুঁজতেন তিনি। সমুদ্রের বালু কেন বদলে যাচ্ছে, সাগরলতা কীভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, সামুদ্রিক বর্জ্য উপকূলের পরিবেশকে কতটা বিপন্ন করছে কিংবা পাহাড়ের পাখি ও বানরের জীবনযাপনে কী পরিবর্তন আসছে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বছরের পর বছর ঘুরেছেন কক্সবাজারের উপকূল, পাহাড় ও সমুদ্রঘেঁষা জনপদে। তার কাছে প্রকৃতি ছিল শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়, ছিল অনুসন্ধানের এক বিশাল জগৎ। সত্যের সন্ধান আর প্রকৃতির অজানা গল্প তুলে ধরতেই কেটে গেছে জীবনের তিন দশকের বেশি সময়।
তিনি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, লেখক ও সামুদ্রিক পরিবেশ গবেষক আহমদ গিয়াস। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে আকস্মিক মৃত্যুতে থেমে গেছে তার সেই নিরন্তর অনুসন্ধান। বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। সাংবাদিকতা করেছেন তিন দশকের বেশি সময়। অথচ পেশাগত জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পরিচিতির বিপরীতে ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। জীবনের শেষ ১৫ বছর কেটেছে দরিয়ানগরের পাহাড়ের ঢালে একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে। সমুদ্র, পাহাড় ও প্রকৃতির অজানা গল্প খুঁজে বেড়ানো মানুষটির নিজের জীবনেও ছিল অভাব-অনটনের দীর্ঘ বাস্তবতা।
দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর দৈনিক আজাদীর কক্সবাজার প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আহমদ গিয়াস। এর আগে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক যায়যায়দিন ও স্থানীয় দৈনিক কক্সবাজারে কাজ করেছেন। মাঠে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ, ঘটনার গভীরে প্রবেশ এবং প্রচলিত বর্ণনার আড়ালে থাকা সত্য অনুসন্ধানের কারণে সহকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘চারণ সাংবাদিক’ হিসেবে।
কোনো ঘটনা ঘটলে শুধু তার বিবরণ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করতেন না তিনি। কেন ঘটেছে, এর পেছনে কারা জড়িত, এর প্রভাব কত দূর বিস্তৃত হতে পারে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেন। বিশেষ করে কক্সবাজারের উপকূলীয় পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রতিবেশ নিয়ে তার অনুসন্ধান ছিল স্বতন্ত্র। সমুদ্রসৈকতের বালুর পরিবর্তন, সাগরলতার বিস্তার ও সংকট, সামুদ্রিক বর্জ্য, পাহাড়ের পরিবেশ, পাখি ও বানরের জীবনযাপন নিয়ে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করেছেন। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক প্রতিবেশ, সমুদ্রতলদেশ এবং উপকূলের পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার সম্পর্কও ছিল তার অনুসন্ধানের অন্যতম বিষয়।
নীল অর্থনীতি, মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে তার প্রতিবেদন ও গবেষণাধর্মী লেখাও প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে। পরিবেশের কোনো পরিবর্তনকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতেন না। একটি বালুচর হারিয়ে যাওয়া, সাগরলতার বিস্তার কিংবা সামুদ্রিক বর্জ্যের দূষণ প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যতের সম্পর্ক খুঁজে দেখতেন। এ কারণে তার অনেক প্রতিবেদন সাধারণ সংবাদবিবরণের গণ্ডি ছাড়িয়ে গবেষণার উপাদান হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞানমনস্কতা তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। স্কুল ও কলেজজীবন থেকেই দেয়ালপত্রিকা, বিজ্ঞানমেলা ও উদ্ভাবনী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিজ্ঞানের প্রতি সেই আগ্রহ পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতা ও পরিবেশ গবেষণায় কাজে লাগিয়েছেন। কোনো তথ্য যাচাই না করে গ্রহণ করা কিংবা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর করার প্রবণতা তার ছিল না। পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিটি বিষয় বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতেন।
সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও ছিলেন আপসহীন। প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে লিখতে দ্বিধা করতেন না। নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকতেন, আবার সহকর্মীদের কাজের ভুলত্রুটি চোখে পড়লে সরাসরি গঠনমূলক সমালোচনা করতেন। তার কাছে সাংবাদিকতা ছিল নিছক জীবিকা নির্বাহের পেশা নয়, বরং মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা পালনের একটি মাধ্যম।
কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী বলেছেন, আহমদ গিয়াস ছিলেন সত্যনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক। সাংবাদিকতায় তার স্বতন্ত্র অবস্থান ছিল। তিনি শুধু ঘটনার বিবরণ তুলে ধরতেন না, ঘটনার পেছনের কারণ ও বাস্তবতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন। বর্তমানে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তাঁর মতো মানুষ খুব বেশি দেখা যায় না।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। নবীন সাংবাদিকদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিতেন। সহকর্মীদের কাছে ছিলেন অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভান্ডার।
সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী বললেন, মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আহমদ গিয়াসের দায়িত্ববোধ ছিল অসাধারণ। সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর কলম কখনো থেমে থাকেনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং মানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দৃঢ়। তার মতো দায়িত্বশীল সাংবাদিকের অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান তাকে এই যুগের সাংবাদিকতার শিক্ষকের স্থানে থাকা একজন মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, সাংবাদিকতায় আহমদ গিয়াসের জ্ঞান, দক্ষতা ও নিষ্ঠা ছিল প্রশংসনীয়। তিনি মনেপ্রাণে সাংবাদিকতা করতেন। পেশার প্রতি তার আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ ছিল অনুকরণীয়।
তবে পেশাগত জীবনে এত দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পরিচিতি ও সহকর্মীদের শ্রদ্ধা অর্জন করলেও ব্যক্তিগত জীবনে সচ্ছলতা গড়ে তুলতে পারেননি আহমদ গিয়াস। শহরের কোলাহল ও চাকচিক্য থেকে দূরে গত প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করেছেন দরিয়ানগরের পাহাড়ের ঢালে একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে। ঘরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট ছড়া, চারপাশের গাছপালা আর প্রকৃতিই ছিল তার নিত্যসঙ্গী।
তার সহকর্মী জসিম উদ্দিন জানালেন, তিন দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করেছেন আহমদ গিয়াস। দেশের পুরোনো ও পরিচিত সংবাদপত্রে কাজ করেছেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে সহকর্মীদের কাছে স্বীকৃতিও পেয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ কর্মজীবনের বিনিময়ে নিজের জন্য গড়ে তুলতে পারেননি আর্থিক নিরাপত্তা। আর্থিক দৈন্যদশা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। শহরের আধুনিক আবাসন কিংবা বিলাসী জীবনযাপনের বদলে জীবনের শেষ দেড় দশক কাটিয়েছেন পাহাড়ের ঢালের জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে।
তার ভাষ্য, পেশাগত পরিচিতি ও ব্যক্তিগত বাস্তবতার এই বৈপরীত্য তার জীবনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলায় অর্জন করেছেন সহকর্মীদের শ্রদ্ধা, পাঠকের পরিচিতি ও অনুসন্ধানী লেখক হিসেবে স্বীকৃতি। কিন্তু সেই স্বীকৃতি তাকে দিতে পারেনি আর্থিক নিশ্চয়তা। তবু অভাবের কাছে থেমে যায়নি জানার আগ্রহ, থামেনি অনুসন্ধান ও লেখালেখি।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দরিয়ানগরের বড়ছড়া এলাকায় একটি দোকানের সামনে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে যান আহমদ গিয়াস। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার আসরের পর দরিয়ানগরে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে দ্বিতীয় জানাজা এবং রাত নয়টায় চকরিয়ার খুটাখালীতে তৃতীয় জানাজা শেষে খুটাখালী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
সহকর্মীদের ভাষায়, আহমদ গিয়াসের মৃত্যুতে কক্সবাজারের সাংবাদিকতা ও পরিবেশবিষয়ক অনুসন্ধানের জগতে তৈরি হয়েছে এক শূন্যতা। সমুদ্রের বালুচর, পাহাড়ের নিঃশব্দ পরিবর্তন কিংবা উপকূলের জীববৈচিত্র্যের অজানা তথ্য খুঁজতে যিনি বছরের পর বছর ছুটে বেড়িয়েছেন, তার অনুসন্ধান থেমে গেলেও রেখে গেছেন বহু লেখা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার স্মৃতি। প্রাচুর্য কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রচলিত সংজ্ঞায় জীবনকে বিচার করেননি তিনি। সত্যের অনুসন্ধান আর প্রকৃতির পাঠের মধ্যেই খুঁজে নিয়েছিলেন নিজের জীবনের অর্থ।



