বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র কেন বারবার বন্ধ হচ্ছে
- সংস্কারের ব্যয় ও কাজের মান নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র
ঘনঘন যান্ত্রিক ত্রুটিতে একের পর এক ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটই এখন অচল। ফলে ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেমে এসেছে শূন্যে।
সবশেষ গত ৫ অক্টোবর ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১ নম্বর ইউনিট এবং পরদিন ৬ অক্টোবর ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩ নম্বর ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২ নম্বর ইউনিটটি বন্ধ রয়েছে। ফলে বর্তমানে কেন্দ্রটির কোনো ইউনিট থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না।
কেন্দ্রটির সবচেয়ে বড় ৩ নম্বর ইউনিটটি প্রায় ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বা জেনারেল ওভারহোলিং শেষে গত ২০ মে উৎপাদনে ফিরেছিল। প্রায় সাত মাস সংস্কারকাজের পর জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ২৫ মে দুটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে ত্রুটি দেখা দিলে ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ ২৯ দিন বন্ধ থাকার পর ২৫ জুন আবার উৎপাদনে ফেরে ইউনিটটি। এরপর প্রায় তিন মাস ১৩ দিন চলার পর গত ৬ অক্টোবর ফের যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায় ৩ নম্বর ইউনিট। অর্থাৎ বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে দীর্ঘ সংস্কারের পর চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও বিকল হয়ে পড়েছে ইউনিটটি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে জেনারেল ওভারহোলিংয়ের জন্য ৩ নম্বর ইউনিটটি বন্ধ করা হয়েছিল। প্রায় সাত মাস ধরে সংস্কারকাজ চলার পর ২০ মে এটি পুনরায় চালু করা হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সংস্কারকাজের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২৫ জুন পুনরায় চালুর পর ৩ নম্বর ইউনিট থেকে প্রায় ১৭০ মেগাওয়াট এবং ১ নম্বর ইউনিট থেকে প্রায় ৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছিল। দুই ইউনিট সচল থাকায় কেন্দ্রটি থেকে মোটামুটি ২৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল। তবে ৫ অক্টোবর ১ নম্বর এবং পরদিন ৩ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সরবরাহও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
৩ নম্বর ইউনিটের জেনারেল ওভারহোলিংয়ে প্রায় ৫২ কোটি টাকা ব্যয় হলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সংস্কারকাজের মান, ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের গুণগত মান, কাজের তদারকি এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেনারেল ওভারহোলিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা। তাই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরও একই ইউনিটে অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার ত্রুটি দেখা দিলে সংস্কারকাজের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে ৩ নম্বর ইউনিটের সক্ষমতা ২৭৫ মেগাওয়াট এবং ১ ও ২ নম্বর ইউনিটের সক্ষমতা ১২৫ মেগাওয়াট করে। দীর্ঘদিন ধরে ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ থাকার পাশাপাশি বাকি দুই ইউনিটেও বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহৃত থাকছে।
সর্বশেষ দুই সচল ইউনিটও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন পুরোপুরি বন্ধ। কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় পার্বতীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজের অভিযোগ করছেন।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক তিনটি ইউনিট থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আবু বক্কর সিদ্দিক সাংবাদিকদের বলেন, দ্রুত ত্রুটি নিরসন করে পুনরায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফেরার চেষ্টা চলছে। এ জন্য প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। তবে ৩ নম্বর ইউনিটের সর্বশেষ ত্রুটির সুনির্দিষ্ট কারণ, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশের ধরন, মেরামতে সম্ভাব্য সময় এবং ওভারহোলিংয়ের পর অল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি দেননি।



