গঙ্গাচড়া
ভাঙা ঘরে মরজিনার দিনরাত, বয়সের ভারেও থামেনি জীবনসংগ্রাম

মরজিনা বেগম
ঘরের চালের কয়েকটি টিন ভেঙে গেছে। কোথাও বেড়া হেলে পড়েছে। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে ঘরের ভেতর। এক পাশে একটু শুকনো জায়গা। সেখানেই কোনোমতে রাত কাটান ৬৫ বছর বয়সী মরজিনা বেগম। জরাজীর্ণ ঘরটি নিয়ে ঝড়-বৃষ্টির সময় আতঙ্কে থাকতে হয় তাকে।
আজ শনিবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের পাইকান পীর সাহেবপাড়ায় নদীর তীরের খাসজমিতে একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন মরজিনা। ঘরের চালের কয়েকটি টিন ভাঙা। বেড়ার কিছু অংশও নড়বড়ে। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। ফলে শুকনো জায়গা খুঁজে কোনোমতে রাত কাটাতে হয় তাকে। ঘরে নেই বিদ্যুৎ, পানির নিজস্ব ব্যবস্থা কিংবা শৌচাগার। অন্যের বাড়ি থেকে পানি এনে পান করতে হয়। গোসল ও ওজুর জন্য যেতে হয় নদীতে। রাতে কেরোসিনের বাতিই তার একমাত্র ভরসা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৩৩ বছর আগে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়েছেন মরজিনা। অভাবের মধ্যেও ধারদেনা করে মেয়ের বিয়ে দেন। মেয়ের বয়স এখন প্রায় ৪০ বছর। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। ফলে মেয়ের কাছ থেকেও কোনো সহায়তা পান না মরজিনা।
বয়সের ভারে তার চোখের দৃষ্টিও কমে এসেছে। শরীর নুয়ে পড়েছে। তারপরও থেমে নেই জীবনসংগ্রাম। খাবারের জন্য মানুষের বাড়িতে কাজ করেন তিনি। কাজের বিনিময়ে পান তিন বেলা খাবার ও মাসে এক হাজার টাকা। এভাবেই কোনোভাবে দিন কাটছে তার।
মরজিনা বেগম বলেন, ‘বাবা, মুই খুব কষ্টে আছুং। ঘরটা একেবারে ভাঙি গেইছে। বৃষ্টি হইলে ঘরের ভিতর পানি পড়ে, রাইতত ঘুমাইতে পারি না। এলা মোর বয়স হইছে, চোখের জ্যুথি নাই। তারপরও প্যাটের দায়ে মানুষের বাড়িত কাম করি কোনমতে বাঁচি আছুং। আর কয় দিন বা বাঁচিম। তোমরা গুলা সবাই মিলি মোক একটা ঘর করি দেও।’
স্থানীয় বাসিন্দা ময়না বেগম বলেন, মরজিনার কষ্টের কথা এলাকার অনেকেই জানেন। চোখে কম দেখায়। তাই চলাফেরা ও কাজকর্ম করতেও তার কষ্ট হয়। তারপরও খাবারের জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয়। তার থাকার ঘরটিও খুব জরাজীর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহ মো. শাখের আলী বলেন, ‘মরজিনা খুব কষ্ট করে জীবন কাটাচ্ছেন। তার ঘরে বিদ্যুৎ নেই, পানির ব্যবস্থা নেই, শৌচাগারও নেই। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। আমরা চাই, তার জন্য কেউ একটি ভালো ঘরের ব্যবস্থা করে দিক।
আলমবিদিতর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আশরাফুল আলম বলেন, মরজিনার অসহায়ত্বের বিষয়টি আমার জানা। তার বয়স্ক ভাতা ও রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ঘরটি খুবই জরাজীর্ণ। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। তিনি সরকারি কোনো সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মরজিনার মতো অসহায় মানুষের জন্য একটি নিরাপদ ঘর ও মৌলিক সুবিধার ব্যবস্থা করা গেলে জীবনের এই সময়ে তার কষ্ট কিছুটা কমবে–এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।





