সীমান্তে মাদকের ১০৫ ‘হটস্পট’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশ জুড়ে মাদকপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সীমান্ত প্রবেশপথগুলো। ভারত ও মিয়ানমার থেকে পথের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অবাধে ঢুকছে মারণঘাতী সব মাদক। মাদকাসক্তি প্রভাব ফেলছে প্রায় সব স্তরেই, তবে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীরাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
স্থলপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথ, নদীপথে দেদার আসছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, আইস, টপেন্টাডল, কোকেনের মতো ভয়াবহ মাদক। এ ছাড়া আকাশপথও ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক পরিবহনে। একই সঙ্গে ডিজিটাল যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন মার্কেটপ্লেস এখন মাদক বিতরণ ও পাচারের নতুন মাধ্যম, যা নজরদারি আরও কঠিন করে তুলছে। নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদকের দিকে ঝুঁকছে ধনীর ছেলেমেয়েরা। এলএসডি, এমডিএমএ, কুশ, খাথসহ পশ্চিমা মাদকে ক্রমেই আসক্তি বাড়ছে তাদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আসা এসব মাদকদ্রব্য চোরাকারবারিদের মাধ্যমে কয়েক হাত ঘুরে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। মাঝেমধ্যে মাদক কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে কৌশল পরিবর্তন করে ফের জড়াচ্ছেন কারবারে। আর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন মূলহোতারা। এ সত্ত্বেও গত ছয় বছরে ১ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৭টি মামলায় ১ লাখ ৬২ হাজার ১৮১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
২৬ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’। প্রতিরোধ ও মাদকাসক্তিমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে।
ডিএনসি বলছে, ভারতের সঙ্গে তিন দিক দিয়ে ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত এবং দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ। বাংলাদেশ নিজে মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান রুট ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এবং গোল্ডেন ওয়েজ’-এর কেন্দ্রে অবস্থিত।
ডিএনসি দেশের ১৮টি সীমান্ত-সংলগ্ন জেলায় ১০৫টি প্রবেশপথ চিহ্নিত করেছে, যেগুলো মাদক পাচারের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এগুলো হচ্ছে— দেশের পশ্চিম সীমান্তের সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া, দেবহাটা, ভোমরা, কাকডাঙ্গী ও পলাশপুর; যশোরের বেনাপোল, পুটখালী, চৌগাছা, নারায়ণপুর, শার্শা এবং আশপাশের এলাকা; চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা, দর্শনা ও জীবননগর; মেহেরপুরের দারিয়াপুর ও বুড়িপটা; রাজশাহীর মনিগ্রাম, চারঘাট, সারদা, ইউছুফপুর, কাজলা, বেলপুকুরিয়া, হরিপুর, গোদাগাড়ি, বাঘা ও রাজশাহী সদর; চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট, শাহবাজপুর, বিনোদপুর, সোনা মসজিদ স্থলবন্দর ও কানসাট; জয়পুরহাটের পাঁচবিবি (প্রধান প্রবেশপথ) এবং দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, হাকিমপুর, কামালপুর, বিরল, আকাশকারপুর, খানপুর, দাইনুর, মালিগ্রাম ও বনতারা।
দেশের পূর্ব সীমান্তের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ, চুনারুঘাট ও মাধবপুর; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার করিমপুর, কসবা, আখাউড়া, সিংগারবিল, পাহাড়পুর ও বিজয়নগর; কুমিল্লার জগন্নাথদীঘি, চৌদ্দগ্রাম, গোলাপশাহ, কালিকাপুর, জগন্নাথপুর, রাজাপুর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও বিবিরবাজার এবং ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম।
দেশের উত্তর সীমান্তের কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, রৌমারী, ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, বাশজানি, বলারহাট, বলাবাড়ি, কুটি চন্দ্রকোনা, পাথরডুবি ও নাখারগঞ্জ; লালমনিরহাটের লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, পাটগ্রাম ও বুড়িমারী; শেরপুরের ঝিনাইগাতি ও নালিতাবাড়ী; ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা।
দেশের দক্ষিণ সীমান্তের কক্সবাজারের জালিয়াপাড়া, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ, সাবরাং, সাউথপাড়া, ধুমধুমিয়া, জদিপাড়া, সাউথ হ্নীলা, লেদাপাড়া, চৌধুরীপাড়া, নোয়াপাড়া, হোয়াইক্যং, তুমব্রু, উখিয়া, কাটাখালী, বালিখালী, ঘুমধুম ও কাটাপাহাড়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে যে পরিমাণ মাদক প্রবেশ করছে এর ৮৮ শতাংশ আসছে ভারত থেকে, মিয়ানমার থেকে আসছে ৮ শতাংশ এবং ৪ শতাংশ আসছে অন্য দেশ থেকে। আর দেশে প্রবেশ করা মাদকের ১৭ শতাংশ পৌঁছাচ্ছে ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায়। আর বাকি ৮৩ শতাংশ মাদক ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে।
জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি) তথ্য বলছে, বাংলাদেশে যত মাদক ঢুকছে, ধরা পড়ছে এর মাত্র ১০ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলছিলেন, মাদকাসক্ত মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা বা ধর্ম-সমাজের কোনো ভয় থাকে না। তারা এমন একটি মানসিক অবস্থায় চলে যায় যে, নানা অপরাধসহ জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে দ্বিধা করে না। মাদকের রুট বা উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং যারা মাদকাসক্ত হয়ে গেছে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে সমাজে ছিনতাই-রাহাজানিসহ নানা অপরাধ কমে আসবে।
তার কথা, ‘এখানে মূল সমস্যা হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা প্রিভেন্টিভ মেজারের অভাব। মাদকের অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী। যেমন বিদ্যুৎ খাতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট থাকে, তেমনি মাদকের ক্ষেত্রেও দেশি-বিদেশি এবং স্থানীয় চক্রের শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এই চক্রের প্রভাব এতটাই যে, তা নীতিনির্ধারকদের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যখন এই মূল উৎসে হাত দেওয়া সম্ভব হয় না, তখন অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা আড়ালে থেকে যায়।’
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গত এক বছরে সীমান্তে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হয়েছে প্রায় ৯২৬ কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য। একই সময়ে ১ হাজার ৮৫০ জনকে আটক করা হয় এবং মামলা করা হয় ১ হাজার ৬২৬টি। গত এক বছরে বিজিবি ১৪ হাজার ৮০৮টি মাদকবিরোধী মতবিনিময় সভার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার মানুষের কাছে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে অন্তত ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। গবেষণায় সিগারেট সেবনকে মাদক ব্যবহার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। গবেষণায় উঠে এসেছে, মাদক ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই তরুণ বয়সের। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮-১৭ বছর বয়সে বা শিশু বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। ৫৯ শতাংশ ব্যবহারকারী মাদক গ্রহণ শুরু করেছে ১৮-২৫ বছর বয়সে। বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক ব্যবহারের প্রধান কারণ। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী বলেছে, মাদক সহজলভ্য।
ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ সাংবাদিকদের বলেছেন, মাদক মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগ নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দেশে সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ কারণে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। বর্তমান আইনি কাঠামো দিয়ে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন। মাদকচক্রগুলো এখন অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই। ফলে অভিযান পরিচালনা ও আইন প্রয়োগে পড়তে হচ্ছে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে। এ বাস্তবতায় আইন সংশোধনের পাশাপাশি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির।




