চোরাপথে রাখাইনে যাচ্ছে নিত্যপণ্য

সংঘাতমুখর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট। বাংলাদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে সে সংকট সামাল দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের একাধিক চক্র এ দেশ থেকে অবৈধপথে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে সীমান্ত লাগোয়া রাখাইনে। সমুদ্রপথে মিয়ানমারে নিত্যপণ্য পাচার করা হচ্ছে।
কোস্ট গার্ড কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, বাঁশখালী, পতেঙ্গা, মহেশখালী থেকে গভীর সমুদ্রপথে কুতুবদিয়া চ্যানেল, সেন্টমার্টিন দিয়ে নাফ নদী হয়ে মিয়ানমার সীমান্তে পৌঁছে যাচ্ছে পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে আলু, চিনি, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ, ডিজেল, সিগারেট, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, ইউরিয়া সার ও সিমেন্ট। এর মধ্যে চিনি, ভোজ্য তেল, ডিজেলসহ ছয়টি পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা এসব পণ্য চোরাইপথে চলে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশে। এর থেকে সরকার না পাচ্ছে রাজস্ব, না পাচ্ছে কোনো কূটনৈতিক সুবিধা।
মিয়ানমারের বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সাবেক হেড অব মিশন অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলামের বিশ্লেষণ, “বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর জান্তা বাহিনী রাখাইনে পণ্য আসার অভ্যন্তরীণ তিনটি পথ ‘আন’, ‘ম্যাগওয়ে’ ও ‘বাগো’ অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এক বছর ধরে ব্লক থাকায় সেখানে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের জোগান দেওয়া ছাড়া তাদের আর বিকল্প কিছু নেই।”
রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপসহ ৮০ শতাংশ এলাকা দেড় বছর ধরে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ২৭০ কিলোমিটারের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তেও তাদের জোরালো অবস্থান। সংঘাতে অস্থির প্রায় ৩৫ লাখ জনসংখ্যার রাজ্যটিতে খাদ্যসংকটে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এমন কথা বলছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপও।
এখন রাখাইনে জ্বালানি তেল ও সিমেন্টের চাহিদা বেশি বলে জানালেন কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির মাহমুদ সুজন। বললেন, ‘সাগরে বিভিন্ন লাইটার জাহাজ ও অয়েল ট্যাংকার থেকে রাখাইনে পাচার করা হচ্ছে তেল। গত এক বছরে আমরা ৩০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল ও প্রায় ১২ কোটি টাকার সিমেন্ট জব্দ করেছি। পাচারের সঙ্গে কাজ করছে কয়েকটি সিন্ডিকেট। তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’
কোস্ট গার্ড ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য আটক করেছে। গত ২৬ এপ্রিল সেন্টমার্টিনে গভীর সমুদ্রে একটি নৌকা থেকে ৯০০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করে কোস্ট গার্ড। সে সময় গ্রেপ্তার করা হয় উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আজিম উল্লাহসহ ১৩ জনকে। রোহিঙ্গা আজিমের নেতৃত্বে কয়েকজন ট্রলার মালিক, মাঝি, ব্যবসায়ীর মিয়ানমারে পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পেয়েছে কোস্ট গার্ড।’
‘আজিম সিন্ডিকেট’ আরাকান আর্মির কাছে সিমেন্ট পাচার করে আসছিল বলে জানালেন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির, ‘গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছে। সিমেন্টগুলো তারা আরাকান আর্মির কাছে নিয়ে যাচ্ছিল। চোরাচালানে কয়েক কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েক কর্মকর্তা জানালেন, আরাকান আর্মির আত্মরক্ষা ও প্রতিপক্ষের ওপর চোরাগোপ্তা হামলার জন্য তৈরি বাংকার, অস্ত্রের গুদামসহ বিভিন্ন পাকা অবকাঠামো নির্মাণে সিমেন্ট ব্যবহার করছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে এ তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিয়ে সন্দিহান এমদাদুল ইসলাম, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নজর এড়িয়ে তাদের পক্ষে কোনো গ্যারিসন নির্মাণ সম্ভব বলে মনে করি না। বাংকার নির্মাণে সিমেন্টের চেয়ে বরং বালু-মাটি বেশি কার্যকর ও নিরাপদ।’
পূর্বাঞ্চলীয় কোস্ট গার্ডের অভিযানে গত জানুয়ারি থেকে চার মাসে প্রায় পঁাচ হাজার বস্তা সিমেন্ট মিয়ানমারে পাচার ঠেকানো গেছে। ২০২৫ সালে উদ্ধার হয় ১৩ হাজার ৪৪৬ বস্তা সিমেন্ট। নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের অভিযানে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জব্দ করা হয় ১ হাজার ৭১২ বস্তা ইউরিয়া, ৯০০ বস্তা আলু ও পেঁয়াজ, ১৬ হাজার ২০০ লিটার জ্বালানি তেল এবং ৯৪০ বস্তা সিমেন্ট। এ সময় আটক করা হয় অর্ধশতাধিক ‘পাচারকারী’কে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) মোহাম্মদ শামীম কবিরের ভাষ্য, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাখাইনের জনগণ ও আরাকান আর্মি চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাচ্ছে না। কিছু দুষ্টলোক রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে পণ্যগুলো তাদের কাছে পাচার করছে। রোহিঙ্গাদের ভাষাজ্ঞান এবং রাখাইনের নাগরিকদের সঙ্গে তাদের পরিচয়ের সুযোগকে কাজে লাগানো হচ্ছে।’
জানুয়ারি থেকে গত চার মাসে কক্সবাজারে হওয়া ৪৭টি চোরাচালান মামলা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানালেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান।






