আধুনিক সংরক্ষণাগারেও পচছে পেঁয়াজ
- রেকর্ড ফলনের পরও পাবনায় সংকটে চাষিরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রেকর্ড ফলনের পর ভালো দামের আশায় আধুনিক সংরক্ষণাগারে পেঁয়াজ মজুদ করেছিলেন পাবনার হাজারো কৃষক। কিন্তু সেই সংরক্ষণাগারেই আষাঢ় মাস থেকে শুরু হয়েছে পচন। কোথাও ছত্রাক, কোথাও অঙ্কুরোদগম— প্রতিদিনই ঝুড়ি ভরে ফেলে দিতে হচ্ছে নষ্ট পেঁয়াজ। সংরক্ষণে ক্ষতির পাশাপাশি বাজারেও মিলছে না প্রত্যাশিত দাম। ফলে উৎপাদন ব্যয় তোলা নিয়েই অনিশ্চয়তায় পড়েছেন দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এই জেলার কৃষকরা।
এই সংকটের বাস্তব চিত্র মিলেছে সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামে। পেঁয়াজ চাষি মনোয়ার পারভেজ মানিক প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে প্রায় ৪০০ মণ দেশি পেঁয়াজ রেখেছিলেন কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আধুনিক সংরক্ষণাগারে। উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘদিন ভালোভাবে সংরক্ষণ করে ধীরে ধীরে বাজারে বিক্রি করা। কিন্তু আষাঢ়ের শুরুতেই ভেস্তে গেছে সেই পরিকল্পনা। সংরক্ষণাগারে থাকা পেঁয়াজেও ধরেছে পচন, কোথাও ছত্রাক, কোথাও অঙ্কুরোদগম। প্রতিদিনই পচা পেঁয়াজ ফেলে দিতে হচ্ছে আলাদা করে।
মনোয়ার পারভেজের এই দুর্ভোগ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জেলার অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী উপজেলা সুজানগর, সাঁথিয়া ও বেড়ার অধিকাংশ কৃষকই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি। আধুনিক সংরক্ষণাগারের পাশাপাশি সনাতন বাঁশের চাতালেও সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
উৎপাদনের দিক থেকে চলতি বছর নতুন রেকর্ড গড়েছে পাবনা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৩ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৯৫ হাজার টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় দেড় লাখ টন বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, এরই মধ্যে সংরক্ষিত দেশি ও হাইব্রিড— দুই ধরনের পেঁয়াজের প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে উচ্চ ফলনের সুফল পাওয়ার বদলে তারা এখন রয়েছেন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায়। এ বছরের সবচেয়ে অস্বাভাবিক বিষয় হলো পচনের সময়কাল। সাধারণত কার্তিক বা অগ্রহায়ণ মাসের দিকে সংরক্ষিত পেঁয়াজে কিছু পচন বা অঙ্কুরোদগম দেখা যায়। কিন্তু এবার আষাঢ় মাসেই ব্যাপক পচন শুরু হওয়ায় সংরক্ষণ পরিকল্পনাই ভেঙে পড়েছে। এতে বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধাপে ধাপে বিক্রির সুযোগও হারিয়ে ফেলছেন তারা। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকের আয়-ব্যয়ের হিসাবে।
সুজানগর উপজেলার হাটখালী গ্রামের কৃষক সেলিম মোর্শেদ রাজশাহী থেকে উন্নতমানের তাহেরপুরি জাতের বীজ এনে পাঁচ বিঘা জমিতে আবাদ করেছিলেন। প্রায় ৪৫০ মণ ফলনের মধ্যে ৩০০ মণ সংরক্ষণ করেন। কিন্তু সংরক্ষণের মধ্যেই পচন ধরায় তার হিসাবে বড় ধরনের গরমিল দেখা দিয়েছে। সেলিমের আশঙ্কা, চলতি মৌসুমে শুধু পেঁয়াজ থেকেই অন্তত ৮০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হবে।
সংরক্ষণে ক্ষতি বাড়ার পাশাপাশি বাজারদরও কৃষকদের সংকট আরও গভীর করছে। সুজানগর উপজেলার চিনাখড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নানের ভাষায়, ‘মৌসুমের শুরুতে দাম কিছুটা সন্তোষজনক থাকলেও এখন ঘটেছে দ্রুত দরপতন। বর্তমানে হাটে সবচেয়ে ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। আর পচা বা ক্ষতিগ্রস্ত পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বছরের এই অস্বাভাবিক ক্ষতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। বেশি ফলনের আশায় অনেক কৃষক স্বল্পমেয়াদি হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ চাষ করেন, যা দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উপযোগী নয়। এর সঙ্গে চারা রোপণ বিশেষ করে পেঁয়াজ উত্তোলনের সময়ে বৃষ্টিপাত ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে অনেক পেঁয়াজে অভ্যন্তরীণ আর্দ্রতা থেকে যায়। পরে সংরক্ষণের সময় সেই আর্দ্রতাই পচনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও জটিল করেছে পরিস্থিতিকে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আধুনিক সংরক্ষণাগারগুলোতে বিদ্যুৎনির্ভর বায়ুপ্রবাহ ব্যবস্থা থাকলেও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেগুলো স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ফলে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর থাকছে না।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, পাবনায় এখন পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৩৩০টি এয়ার ফ্লো মেশিন। এর মধ্যে গত বছর দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩৩০টি এবং চলতি বছর ৩ হাজারটি।
অবশ্য কৃষি কর্মকর্তারা পরিস্থিতিকে এখনই বড় সংকট হিসেবে দেখছেন না। পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিকের ভাষ্য, ‘লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি উৎপাদন হওয়ায় বাজারে ঘাটতির আশঙ্কা নেই। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে।’
তার আশা, মোট উৎপাদনের অনুপাতে শেষ পর্যন্ত কৃষকদের লোকসান খুব বড় অঙ্কে পৌঁছাবে না।






