নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজের ভগ্নদশা

ছবি: আগামীর সময়
এ যেন রবীন্দ্রসংগীতের সেই চরণের সার্থক রূপায়ণ— ‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়’। কথাটি উঠে এলো ঐতিহ্যবাহী আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজের’ জরাজীর্ণ দশা দেখে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে সাড়ে ১৬ শতাংশ জায়গার ওপর ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত অধ্যক্ষ খগেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর গড়া এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ছয় দশকে ৯ হাজার শিক্ষার্থীর জীবনে আলো ছড়িয়ে দিলেও নিজে রয়ে গেছে ঘোর অন্ধকারে। সাড়ে ৪০০ শিক্ষার্থী, চার শিক্ষক, পাঁচ কর্মচারীর জন্য ভবন, ক্লাস রুম, অফিস কক্ষ, টয়লেট, পানি সরবরাহের ব্যবস্থা— সবকিছু চলছে জোড়াতালি দিয়ে। ব্যাংকে কলেজের নামে ৬ কোটি টাকার এফডিআর থাকলেও পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে কলেজের নামে জমি রেজিস্ট্রি করতে দেরি হওয়ায় ঝুঁকি নিয়েই চলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।
২০০৮ সালে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় প্রথম দিকে নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজ থাকলেও এর সংস্কারে নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। জরাজীর্ণ কলেজ ভবনটির মূল ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে বিভিন্ন সময় আহত হন অনেক শিক্ষার্থী। বৃষ্টিতে চুইয়ে পড়ে পানি। ফলে নষ্ট হয়ে যায় পাঠদানের বিভিন্ন উপকরণ।
গত ২২ জুন ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। এসব কারণসহ সামান্য বৃষ্টি হলেই দুর্ঘটনার আশঙ্কায় শিক্ষার্থীরা কলেজে আসেন না। শিক্ষক-কর্মচারীরাও থাকেন আতঙ্কিত। শিক্ষার্থী ফয়জুন্নেসা আল-আমিনের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা, ‘অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমরা ক্লাস করি। ভাঙাচোরা ভবন, মলিন দেয়াল, ঝুঁকিপূর্ণ ছাদ নিয়ে আতঙ্কে থাকি সবসময়। ছাদ থেকে পলেস্তেরা খসে পড়ে মাঝেমধ্যে ঘটে দুর্ঘটনা। তাই ভয়ে কলেজে আসতে চান না শিক্ষার্থীরা। সামান্য বৃষ্টিতে পানি চুইয়ে পড়ায় কলেজে বসার জায়গা পাওয়া যায় না।’
কলেজের কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মোট তিনটি আইন কলেজ ছিল। দুটি ঢাকায়, একটি প্রাচীন শহর নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ আদালতের ১৬০০ আইনজীবীর অধিকাংশই পাস করেছেন এই কলেজ থেকে। আওয়ামী লীগ সরকারের পুরোটা সময় শামীম ওসমান, এর আগে ২০০০-২০০৭ গভর্নিং বডিতে দায়িত্ব পালন করা তৈমূর আলম খন্দকার এই কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হলেও, নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ন্যূনতম অবদান রাখেননি। বিগত সময়ে যারা আইন কলেজ পরিচালনা করেছেন তারা চাইলে এই পরিত্যক্ত সম্পত্তি কিনে এই আইন কলেজে ভবন নির্মাণ করতে পারতেন। কিন্তু করেননি। কলেজের নামে পরিত্যক্ত সম্পত্তির ক্রয় দলিল দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি তাদের।
শিক্ষার্থী সবুজ মিয়া জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের মতো উন্নত ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি জেলায় পুরনো একটি আইন কলেজের অবস্থা এতটা শোচনীয়, এতটা দুর্বিষহ, সেটি কোনোভাবে প্রত্যাশিত নয়। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার রুমগুলো মানসম্মত নয়। টয়লেট, পানি খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে মাত্র গত বছর। তবে দুর্ঘটনার ভয়ে শিক্ষার্থীরা না আসায় সেগুলোও কোনো কাজে আসছে না।
কলেজের গভর্নিং কমিটির সদস্য আইনজীবী মাহবুবুর রহমান মাসুম আগামীর সময়কে বলেছেন, কলেজের জমিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারি খাতায় লিপিবদ্ধ। এখানে ভবন তৈরি করতে হলে প্রথমে জমিটি কলেজের নামে রেজিস্ট্রি করতে হবে। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার গত মাসে কলেজটি পরিদর্শন করেছেন। গভর্নিং বডির সভাপতি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পরিত্যক্ত সম্পত্তিটি কলেজের নামে রেজিস্ট্রি করতে সুপারিশ করে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠিয়েছেন। সেটি অনুমোদনের পর বাকি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।
কলেজের অধ্যক্ষ আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এরই মধ্যে ১৯৭২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জমির ইজারা ভাড়া হিসেবে ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। গত ১৩ মে সব শেষ সভায় গভর্নিং বডির সভাপতি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হান কবিরের সভাপতিত্বে কলেজের ক্রয় সম্পত্তি ও পুরনো ভবন বিক্রির মূল্য নির্ধারণ করে দলিল সম্পাদনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এখনো দলিল রেজিস্ট্রির অনুমতিপত্র পাঠানো হয়নি।
কলেজের গভর্নিং বডির আহ্বায়ক ও জেলা প্রশাসক রায়হান কবির আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বর্তমান যে ভবনটি রয়েছে, সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করার জন্য বিভাগীয় কমিশনার বরাবর পাঠিয়েছি। সেখান থেকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ড অনুমোদন দেওয়ার পর বর্তমান পুরনো ভবনটি ভেঙে আধুনিক একটি ভবন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।’




