কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :
দরজায় ‘পরিসংখ্যানবিদ’, নিয়োগপত্রে ‘স্বাস্থ্য সহকারী’

ছবি: আগামীর সময়
প্রতিদিনের মতোই সকাল। কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর ভিড় বাড়ছে। কেউ টিকাদানের খোঁজে, কেউ চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষায়। এই ব্যস্ততার মাঝেই প্রশাসনিক ব্লকের একটি কক্ষের সামনে চোখ আটকে যায়। দরজায় একটি নামফলক-তার নিচে লেখা ‘পরিসংখ্যানবিদ’।
যে কেউ স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেবেন, এটি একজন নিয়মিত পরিসংখ্যানবিদের কক্ষ। কিন্তু প্রশাসনিক নথি খুলতেই সামনে আসে ভিন্ন এক বাস্তবতা। ওই কক্ষে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তি আসলে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারী। আর এভাবেই আট বছরেরও বেশি ধরে একটি শূন্য পদ, অতিরিক্ত দায়িত্ব, অফিস আদেশ, নামফলক ও সরকারি ব্যবস্থাপনার নানা প্রশ্ন মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক নীরব প্রশাসনিক গল্প।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক। তিনি ২০০৪ সালে কালীগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। মাঠপর্যায়ে জনস্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান ও আইটি শাখার দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বাস্থ্য সহকারীদের কাজ মূলত টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন, রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। অথচ কাজী নাজমুল হককে প্রতিদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১০২ নম্বর কক্ষে তথ্য-উপাত্ত ও কম্পিউটারভিত্তিক কাজ করতে দেখা যায়।
সরেজমিন দেখা গেছে, তার কক্ষের দরজায় নামের নিচে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘পরিসংখ্যানবিদ’। সেখানে কোথাও ‘ভারপ্রাপ্ত’, ‘অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত’ বা ‘চলতি দায়িত্ব’ শব্দ নেই। ফলে সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও তাকে স্থায়ী পরিসংখ্যানবিদ বলেই মনে করেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সাদেকুর রহমান আকন্দের দায়িত্বকালে কর্মরত পরিসংখ্যানবিদ মীর সাইফুল ইসলাম বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর একই বছরের ১২ জুলাই এক অফিস আদেশে স্বাস্থ্য সহকারী মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হককে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে পরিসংখ্যানবিদের দায়িত্ব দেন তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সাদেকুর রহমান আকন্দ।
কাজী নাজমুল হক জানিয়েছেন, পরে ২০১৯ সালের ৭ জুলাই তৎকালীন গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মো. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত আরেকটি আদেশে তাকে শূন্য থাকা পরিসংখ্যানবিদ পদে নিজ বেতনে দায়িত্ব পালনের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ওই আদেশেই উল্লেখ ছিল, নিয়মিত পরিসংখ্যানবিদ পদায়ন হলে তাকে আবার স্বাস্থ্য সহকারী পদে ফিরে যেতে হবে।
তবে ওই নথিও প্রশ্নের বাইরে নয়। প্রতিবেদকের হাতে আসা কপিতে দেখা যায়, তারিখের স্থানে পরে হাতে লেখা ‘৭’ বসানো হয়েছে। এ ছাড়া মূল নথির অন্তত দুটি জায়গায় কম্পিউটারে টাইপের পরিবর্তে হাতে লেখা সংশোধন রয়েছে। এতে নথিটির প্রামাণিকতা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা পরিসংখ্যানবিদের পদটি অনলাইন জনবল ব্যবস্থাপনায় পূরণ দেখানো হয়েছিল।
অভিযোগকারীদের দাবি, তথ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকার কারণে কাজী নাজমুল হক এ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। এর ফলে ওই পদে নতুন কর্মকর্তা পদায়নের সুযোগ দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে প্রাপ্য শ্রান্তি বিনোদন ভাতা গ্রহণ করেছেন। বিষয়টি সরকারি বিধিমালার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বললেন, অনলাইন জনবল ব্যবস্থাপনা ও তথ্য হালনাগাদের দায়িত্বে থাকায় দীর্ঘদিন শূন্য পদটি পূরণ দেখানো হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বে থাকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি প্রশাসনিক প্রভাবও বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক বলছেন, আমি কোনো পদ দখল করে বসে নেই। কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। অফিসের পরিচয়ফলক বা দায়িত্ব বণ্টন প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়েছে। বেতন-ভাতা সরকারি নিয়ম অনুসারেই গ্রহণ করেছি।
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ বলছেন, আমি এখানে যোগদানের আগ থেকেই প্রায় আট বছর ধরে স্বাস্থ্য সহকারী নাজমুল হক পরিসংখ্যানবিদের দায়িত্ব পালন করছেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর জানতে পারি পদটি শূন্য রয়েছে। এরপর থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে পদটি শূন্য হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে। নামফলকেও এখন থেকে ‘ভারপ্রাপ্ত’ উল্লেখ করা হবে।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলছেন, পরিসংখ্যানবিদের পদ শূন্য থাকায় স্বাস্থ্য সহকারী নাজমুল হককে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নামফলকে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ বা অনুরূপ উল্লেখ থাকা উচিত ছিল।
একটি দরজার নামফলক থেকেই শুরু হওয়া এই অনুসন্ধান শেষ হয়েছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। আট বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ কেন শূন্য রইল? অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মচারীর পরিচয় কেন স্থায়ী পদের মতো ব্যবহৃত হলো? অনলাইন জনবল ব্যবস্থাপনায় যদি সত্যিই শূন্য পদ পূরণ দেখানো হয়ে থাকে, তবে সেটি কার সিদ্ধান্তে? আর প্রশাসনিক এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কোথাও কি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে শুধু একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে। সেই তদন্তই বলে দেবে এটি কি শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন ছিল, নাকি দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি অনিয়মের গল্প।






