ব্যস্ত শহরে চড়ুইয়ের রাজ্য

দিনের যানজট আর কোলাহলের মধ্যেই হঠাৎ কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
গোধূলি নামতে না নামতেই বদলে যায় ফরিদপুর শহরের জনতা ব্যাংক মোড়ের পরিবেশ। দিনের যানজট আর কোলাহলের মধ্যেই হঠাৎ কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। রাজেন্দ্র মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে একটি মাধবীলতা গাছে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে বসতে শুরু করে হাজারো চড়ুই। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবুজ পাতার ফাঁকে পাখিদের ভিড়ে গাছটি যেন পরিণত হয় জীবন্ত এক অভয়ারণ্যে।
একসময় গ্রামের কুঁড়েঘর, বাঁশের কড়িকাঠ কিংবা খড়ের চাল ছিল চড়ুইয়ের নিরাপদ আশ্রয়। নগরায়ণের সঙ্গে হারিয়েছে সেই আবাস। গ্রামেও এখন আগের মতো দেখা মেলে না পরিচিত এই ছোট্ট পাখিটির। অথচ ফরিদপুর শহরের ব্যস্ততম এলাকায় দুই দশক ধরে একটি মাধবীলতা গাছই হয়ে উঠেছে হাজার হাজার চড়ুইয়ের রাতের ঠিকানা।
সম্প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে দলে দলে চড়ুই এসে বসছে গাছের ডালে। মুহূর্তেই চারপাশ ভরে ওঠে কিচিরমিচির শব্দে। দূর থেকে মনে হয়, যেন ফুলে ছেয়ে গেছে পুরো গাছ। পথচারীরা থেমে দাঁড়ান, কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন, কেউ নীরবে উপভোগ করেন প্রকৃতির এই বিরল দৃশ্য। ভোরের আলো ফোটার আগেই আবার দল বেঁধে উড়ে যায় তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা ঋতু পরিবর্তন, কোনো কিছুই বদলাতে পারেনি এই পাখিদের নিয়ম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা ফিরে আসে একই গাছে, আবার ভোরে উড়ে যায় অজানা গন্তব্যে।
গাছটির মালিক রুমা সাহা বলেছেন, ‘সন্ধ্যা হলেই পাখিগুলো ফিরে আসে। তখন মনে হয় পুরো গাছে যেন উৎসব বসেছে। ওরা আমাদের পরিবারেরই অংশ হয়ে গেছে। সবাই মিলে খেয়াল রাখি, যেন কেউ তাদের বিরক্ত না করে।’
স্বর্ণপট্টির ব্যবসায়ী রাম দত্ত বললেন, ‘ছোটবেলায় গ্রামে অনেক চড়ুই দেখেছি। এখন সেই দৃশ্য আর নেই। শহরের মাঝখানে একটি গাছে এত পাখির সমাবেশ সত্যিই বিস্ময়কর। দোকানে বসেই প্রতিদিন তাদের দেখি।’
ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী চিন্ময় বলেছেন, ‘হঠাৎ চোখে পড়তেই দাঁড়িয়ে গেলাম। শহরের ভেতর এমন দৃশ্য দেখব, ভাবিনি। মনে হচ্ছে প্রকৃতি এখনো আমাদের জন্য কিছু বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে।’
শুধু দর্শনার্থীরাই নন, আশপাশের ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারাও যেন এই চড়ুইদের অভিভাবক। কেউ যেন পাখিদের বিরক্ত না করে, সে বিষয়ে সবাই সতর্ক থাকেন।
জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ বলেছেন, ‘শহরের মধ্যে একটি গাছে হাজার হাজার পাখির আশ্রয় নেওয়া অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। এই আবাসস্থল রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ, কংক্রিটের বিস্তার এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল কমে যাওয়ায় চড়ুইয়ের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। সেই বাস্তবতায় ফরিদপুর শহরের এই মাধবীলতা গাছ শুধু একটি গাছ নয়, এটি হয়ে উঠেছে নগরের বুকে হারিয়ে যেতে বসা এক পরিচিত পাখির নিরাপদ আশ্রয়।




