রাণীনগরে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব অনেকে, ভাঙছে সংসারও

প্রতীকী ছবি
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়া। মোবাইল ফোনে জুয়া খেলে সর্বস্ব হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন অনেকে। দেনার টাকা জোগাড় করতে কেউ চুরি-ছিনতাইসহ অপরাধে জড়াচ্ছেন, কেউ ছেড়ে যাচ্ছেন বাড়ি। বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি, ভাঙছে সংসার। সম্প্রতি অনলাইন জুয়ায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হওয়া তিন ব্যাংক কর্মকর্তার ছিনতাইয়ের পরিকল্পনায় যুক্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তাদের পরিকল্পনায় একটি ব্যাংকের প্রায় ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানায়, রাণীনগর উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়ার আসক্তি। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজে জুয়া খেলার সুযোগ থাকায় শ্রমিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও বেকার যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রথম দিকে কেউ কেউ লাভের মুখ দেখলেও অধিকাংশই হারাচ্ছেন জমানো টাকা। পরে ঋণ করে, সুদে টাকা নিয়ে কিংবা সম্পদ বিক্রি করেও অনেকে জুয়ার আসক্তি থেকে বের হতে পারছেন না।
রাণীনগর থানা-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে আবাদপুকুর ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট শাখার দুই কর্মকর্তা সান্তাহার থেকে টাকা তুলে মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন। পথে আবাদপুকুর-আদমদীঘি সড়কের পারইল ব্রিজ এলাকায় তাদের মারধর করে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাই করা হয়। এ ঘটনায় তিন ব্যাংক কর্মকর্তাসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ৯ অক্টোবর নওগাঁর পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলনে এ ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
পুলিশের দাবি, অনলাইন জুয়ায় টাকা হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ায় তিন ব্যাংক কর্মকর্তা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনায় যুক্ত হন।
উপজেলার হরিপুর গ্রামের শ্রী চন্দ্র দাস জানিয়েছেন, তার গ্রামে জুয়ায় হেরে চার-পাঁচজন একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। দেনার দায়ে আরও দুই-তিনজন বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।
গোপিনাথপুর গ্রামের মাছচাষি মোজাহার হোসেন বলেছেন, ‘অনলাইন জুয়ায় একবার ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জিতে একটি মোটরসাইকেল কিনেছিলাম। পরে প্রায় দেড় লাখ টাকা হারিয়ে এখন জুয়া খেলা ছেড়ে দিয়েছি।’
কালীগ্রাম ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার হেলাল উদ্দীন বলেছেন, এক প্রবাসীর স্ত্রী অনলাইন জুয়ায় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা হারানোর পর তার স্বামী বিদেশ থেকে তাকে তালাক দেন। জুয়ার কারণে আর্থিক সংকট ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে অনেক সংসার ভেঙে যাচ্ছে।
একডালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শাহজাহান আলী জানিয়েছেন, গ্রাম আদালতে আসা অভিযোগগুলোর মধ্যে জুয়ায় সর্বস্ব হারিয়ে পারিবারিক অশান্তির বহু ঘটনা রয়েছে। এমনকি তার নিজের গাড়িচালকও অনলাইন জুয়ায় টাকা হারিয়ে কয়েক দিন আগে প্রায় ৫০ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
রাণীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকারিয়া মন্ডল জানিয়েছেন, ব্যাংকের টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বাইরে অনলাইন জুয়ায় জড়িত অন্য কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। এ-সংক্রান্ত অন্য কোনো মামলাও হয়নি। তবে নতুন আইন অনুযায়ী অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান চালানো হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাবিলা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়ায় জড়িত কাউকে এখনো ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়নি। নতুন আইন অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়িয়েও অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।




