ঘণ্টাটা কলিজায় মারে বাড়ি

সংগৃহীত ছবি
‘ভোর সকালে উঠে আমি চা-পান বানাই, রুটিটা সিদ্ধ হওয়ার সময় দিল না, বলি সময় দিল না/আঁচলে হাত পুচে আমি টুকরী লিয়ে দৌড়ি/ লো ঝিঙা ফুল, ঘণ্টাটা কলিজায় মারে বাড়ি/ মিছে আসা মিছে বুলি, তবু সংসার করি লো ঝিঙা ফুল...।’
চা শ্রমিকদের গানের এই কলিতেই যেন ফুটে উঠেছে তাদের দুঃখ-কষ্টের গল্প। তাদের প্রতিদিনের জীবন, যেখানে ত্যাগ আর অনিশ্চয়তাই বাস্তবতা।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানের শ্রমিক সুরভী তেলেঙ্গা বলছিলেন, ‘সকাল থাইক্যা সন্ধ্যা পাতাই তুলি, তাও পেট ভইরা খাইতে পারি না। পোলাপানরে ভালো কইরা পড়াইতে পারি না, ভালো খাবারও দিতে পারি না। হেইডাই সবচেয়ে কষ্ট। সারা জীবন চা বাগানেই রইলাম; কিন্তু আমরার বাগানির জীবনডা আর বদলাইলো না।’
সকালে বানানো আটা-রুটি, সঙ্গে মরিচ ও চানাচুর মেশানো চা পাতার চাটনি— যা ছিল তা গত সোমবার বিকালের খাবার। তা খেতে খেতেই বলছিলেন দুঃখের কথা। সুরভীর এই আক্ষেপ শুধু তার একার নয়; এটি যেন পুরো চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর জীবনের প্রতিচ্ছবি। হবিগঞ্জের মাধবপুর, চুনারুঘাট, নবীগঞ্জ ও বাহুবল— এই চার উপজেলায় প্রধান ২৪টিসহ মোট ৪১টি চা বাগান। এসব বাগানে স্থায়ী ২৫ হাজার ও অস্থায়ী ১০ হাজারসহ মোট শ্রমিক প্রায় ৩৫ হাজার। তাদের হাতে প্রতি মৌসুমে উত্তোলন হয় অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ কেজি চা পাতা, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। অথচ এই শিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে নেই আলাদা কোনো বাজেট। চা শ্রমিকের সন্তান ও চুনারুঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খাইরুন আক্তারের ভাষ্য, ‘একটি চা গাছ যেমন ২৬ ইঞ্চি হওয়ার আগেই ছেঁটে ফেলা হয়, তেমনিভাবে পরিকল্পিতভাবেই একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা হয় চা শ্রমিকদের জীবনও।’
চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল জানালেন, দেশে যত সরকারই এসেছে, ভোটের আগে সবাই আশার বাণী শুনিয়েছে, কিন্তু চা শ্রমিকদের জীবনে আশানুরূপ কোনো পরিবর্তন তারা করেননি। স্থায়ী শ্রমিকরা ১৮৭ টাকা মজুরির সঙ্গে সপ্তাহে সাড়ে তিন কেজি আটা পেয়ে থাকেন। অস্থায়ী শ্রমিকরা পান না সেই আটাটাও। যা দিয়ে তিন থেকে চার সদস্যের সংসার চলে না। সন্তানদের লেখাপড়ার কোনো সুযোগই নেই। ফলে শ্রমিকরা দিন দিন বাগান থেকে বেরিয়ে বাইরে কাজে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে চা শিল্প টিকবে না।




