ভাষাসৈনিক ড. নুরুল হক ভূঁইয়ার নামে সড়ক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি

ড. এএসএম নুরুল হক ভূঁইয়া। ছবি: আগামীর সময়
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রথম আহ্বায়ক, ভাষাসৈনিক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. এএসএম নুরুল হক ভূঁইয়ার অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং তার নামে সড়কের নামকরণের দাবি জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার এলাকাবাসী। একই সঙ্গে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করারও দাবি তুলেছেন তারা।
ড. নুরুল হক ভূঁইয়ার গ্রামের বাড়ি সোনারগাঁ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে।
স্থানীয়দের দাবি, ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তিনি আজও যথাযথ মূল্যায়ন পাননি।
ভাষাসৈনিকের নাতি বায়জিদ হোসেন ভূঁইয়া জানান, তার দাদা ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক মানুষ। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তার অবদানের কথা জানে না। তাই সোনারগাঁ উপজেলার তলতলা থেকে বারদী সড়কটি ভাষাসৈনিক ড. নুরুল হক ভূঁইয়ার নামে নামকরণের দাবি জানান তিনি।
গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা কবি জামান ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, ড. নুরুল হক ভূঁইয়া ছিলেন কালোত্তীর্ণ পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, ভাষাসৈনিক, বিজ্ঞানী ও সমাজহিতৈষী। তার মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তার স্মৃতি সংরক্ষণে নামে একটি সড়ক, সমাধি সংরক্ষণ এবং একটি পাঠাগার নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, ড. নুরুল হক ভূঁইয়া রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না। তিনি ভাষাসৈনিকের নামে সড়ক নামকরণ, কবর সংরক্ষণসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
ড. নুরুল হক ভূঁইয়া ১৯২৩ সালের ১ মে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম আবু সাঈদ মোহাম্মদ নুরুল হক ভূঁইয়া। ১৯৩৯ সালে মহজমপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন। পরে জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর সেখানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং একই বছর স্যার এ এফ রহমান হলের প্রথম প্রভোস্টের দায়িত্ব পান। পরে অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ১৯৮৪ সালে অবসর নেন। অবসরের পরও ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত একই বিভাগে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
দেশপ্রেমের কারণে বিদেশে উচ্চশিক্ষার একাধিক সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ড. নুরুল হক ভূঁইয়া। ১৯৪৮ সালে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ এবং ১৯৬০ সালে কলম্বো প্ল্যান ও পাকিস্তান অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের ফেলোশিপের জন্য নির্বাচিত হলেও বিদেশে যাননি। পরে ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত তমদ্দুন মজলিসের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রথম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি ছয় দফা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
গবেষণাতেও ছিল তার উল্লেখযোগ্য অবদান। ১৯৭৩ সালে তিনি পাটের অগ্নিরোধক মিশ্রণ উৎপাদনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এছাড়া বিমান ইঞ্জিনে ব্যবহৃত 'মলিবডেনাম ডাই-সালফাইড' নামের সলিড লুব্রিকেন্ট নিয়ে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন।
১৯৯৮ সালের ২ এপ্রিল ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও তার অবদানের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।




