ফসল ফলিয়ে লোকসানে কৃষক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৈরী আবহাওয়া, জলাবদ্ধতা আর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে হাওরে বোরো ধান ঘরে তুলেছেন কৃষক। আশা ছিল, ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ, সংসারের খরচ মেটানো আর পরের মৌসুমের চাষাবাদের প্রস্তুতি নেবেন। কিন্তু বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় সেই আশার গুড়ে বালি। ভালো মানের ধান বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ উঠছে না। আর জলাবদ্ধতায় কালচে হয়ে যাওয়া ধানের দাম নেমেছে মণপ্রতি ৬০০ টাকায়। ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলিয়েও লোকসানের মুখে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষক।
তাদের ভাষ্য, জলাবদ্ধতায় কালচে হয়ে যাওয়া ধান বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৬০০-৯০০ টাকায়। ভালো মানের ধানের দামও নেমে এসেছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৮০ টাকায়। অথচ গত বছর এ সময় প্রতি মণ ধান বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। এক মণ ধান উৎপাদনে এবার ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১০০ টাকা। অথচ সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ২৮০ টাকায়। কোথাও কোথাও আবার
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের ইসলাম গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান জানালেন, প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা। অথচ সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ১ হাজার ২০ টাকায়। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘এভাবে ধানের দাম কম থাকলে কৃষিকাজ করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।’
হাওরাঞ্চলের অন্যতম বড় ধানের আড়ত সুনামগঞ্জের মধ্যনগর বাজারে দেখা গেছে, কালচে ধান কিনতে আগ্রহ কম মিল মালিকদের। কোনো কোনো আড়তে এসব ধানের দাম বলা হচ্ছে মণপ্রতি ৬০০-৬৭০ টাকা। বিপরীতে ভালো মানের ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২৮০ টাকায়। একই বাজারে ধানের মানভেদে দামের এই বড় ব্যবধান কৃষকদের লোকসানের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মধ্যনগর বাজারে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক চিত্ত তালুকদার জানালেন, জলাবদ্ধতায় তার ধান কালচে হয়ে গেছে। তাই ধানের নমুনা নিয়ে বিভিন্ন আড়তে ঘুরছেন। একটি আড়তে মণপ্রতি ৬০০ টাকা দাম বলা হলেও তিনি ধান বিক্রি করেননি। তবে একই বাজারের কৃষক কফিল উদ্দিন দীর্ঘদিন ঘুরে শেষ পর্যন্ত মণপ্রতি ৬৭০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
শুধু কালচে ধান নয়, ভালো মানের ধান উৎপাদন করেও স্বস্তিতে নেই কৃষকরা। মধ্যনগরের কৃষক পার্থ তালুকদারের ভাষ্য, তার ধান মণপ্রতি ১ হাজার ২৮০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। কিন্তু সার, কীটনাশক, ডিজেল, সেচ, শ্রমিকের মজুরিসহ উৎপাদনের সব খাতে খরচ বেড়েছে। ফলে এই দামেও উৎপাদন খরচ তোলা সম্ভব হবে না।
মধ্যনগর বাজারের আড়তদারদের ভাষ্য, ধানের রঙ কালচে হয়ে যাওয়ায় মিল মালিকরা এবার ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন কম। এতে বাজারে বেচাকেনাও কমেছে। আড়তদার আলীনূর মোড়লের ভাষায়, দেশের বিভিন্ন এলাকার মিল মালিকরা মধ্যনগর থেকে ধান কিনে নিয়ে যান। তাদের হয়ে ধান সংগ্রহ করে দেওয়ার বিপরীতে আড়তদাররা প্রতি মণে ২৮ টাকা কমিশন পান। তবে এ বছর ধানের রঙ নষ্ট হওয়ায় মিল মালিকরা ধান কিনছেন কম।
তবে ধানের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু রঙ নয়, চালের উৎপাদন হার ও বাজারমূল্যও বিবেচনায় নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন মিল মালিকদের প্রতিনিধিরা। আশুগঞ্জের এক মিল মালিকের প্রতিনিধি নুরুল হক বলেছেন, ‘কালচে ধান থেকেও চালের পরিমাণ ভালো পাওয়া গেলে তুলনামূলক ভালো দাম দেওয়া হয়। আবার চালের উৎপাদন হার ভালো হলেও বাজারে চালের দাম কম থাকলে ধানের দাম কমাতে হয়।’
মধ্যনগর ও ধর্মপাশার কৃষকরা বলছেন, ধানের দাম কমলেও চালের দাম কমেনি। বাংলাদেশ কৃষক সমিতি সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদারের অভিযোগ, জলাবদ্ধতার কারণে ধানের রঙ কিছুটা কালচে হয়ে যাওয়ায় চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগ নিচ্ছেন। কৃষকরা লোকসান গুনলেও লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এ বছর ধান বিক্রি করে যে পরিমাণ লোকসান হচ্ছে, তা আগামী তিন বছরেও পুষিয়ে ওঠা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, জলাবদ্ধতায় ধানের মান কিছুটা কমে যাওয়ায় বাজারে দাম কমেছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) ফেরদৌস জাহানের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবার ধানের মান কিছুটা কমেছে, এজন্যই দাম কম।
একই কথা বলেছেন সুনামগঞ্জ কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আহমদ আসিফুর রব। তার ভাষ্য, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এবার ধানের দাম তুলনামূলক কম। তবে দাম কমলেও সেই অনুপাতে চালের দাম কমেনি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।



